ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

প্রথম পাতা » আন্তর্জাতিক » ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫



ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ‘বন্ধ’ ঘোষণা করার পর পরই ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। মাসব্যাপী ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মধ্যে ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণা সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা এই পদক্ষেপকে ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘ঔপনিবেশিক হুমকি’ বলে আখ্যায়িত করেছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আগেই সতর্ক করেছিলেন যে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করতে মিথ্যা অভিযোগ বানাচ্ছে। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।

সামরিক প্রস্তুতি ও হুমকির তীব্রতা: সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে কথিত মাদকবাহী নৌকা লক্ষ্য করে একাধিক হামলার পর দক্ষিণ ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিশাল রণতরী মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় অন্তত ৮৩ জন নিহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের কোনো প্রমাণ দেয়নি।

গত সপ্তাহে মাদুরোর উপর চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠী কার্টেল দে লস সোলেসকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংস্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এর ভিত্তিতে ট্রাম্প সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন যে তিনি সিআইএ-কে ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযান চালানোর অনুমোদন দিয়েছেন এবং বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড, অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ, হাজার হাজার সৈন্য ও এফ-৩৫ স্টিলথ জেট ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন করেছেন। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, দেশের অভ্যন্তরে স্থল হামলা খুব দ্রুতই আসতে পারে।

আইনি বৈধতা এবং সমালোচকদের প্রশ্ন: ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও মার্কিন সংবিধান লঙ্ঘন করছে বলে সমালোচকরা যুক্তি দিচ্ছেন। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন বোট লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’। মার্কিন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্রুস ফেইন বলেছেন, ট্রাম্প সংবিধানবহির্ভূত কাজ করছেন এবং হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, শুধুমাত্র কংগ্রেসই সামরিক বাহিনীকে হামলার অনুমোদন দিতে পারে। কার্টেল দে লস সোলেসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংস্থা ঘোষণা করে ট্রাম্প প্রশাসন বোঝাতে চাইছে যে এটি আর দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ নয় বরং একটি অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন অভিযান।

মাদুরোর প্রতিক্রিয়া ও শান্তির আহ্বান: কারাকাস ট্রাম্পের এই আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণাকে ‘অবৈধ এবং অযৌক্তিক আগ্রাসন’ বলে নিন্দা করেছে। মাদুরো প্রায়শই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হচ্ছেন এবং যুদ্ধের বিরোধিতা করে শান্তির আহ্বান জানাচ্ছেন। স্প্যানিশ ও ইংরেজি মিশিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই, চিরতরে।’ তবে গত সপ্তাহে মাদুরো সম্পূর্ণ সামরিক পোশাকে জাতীয় বীর সিমন বলিভারের তলোয়ার হাতে নিয়ে ‘সাম্রাজ্যবাদী হুমকির’ বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেন।

শত্রুতার আসল কারণ কী: বিদেশ নীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাদুরো সরকারের প্রতি ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির মূল কারণ হলো ভেনেজুয়েলার বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদ এবং পশ্চিমা গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী সালভাদর সান্তিনো রেগিলমে বলেছেন, ওয়াশিংটন চায় ভেনেজুয়েলা চীন, রাশিয়া বা ইরানের পরিবর্তে দৃঢ়ভাবে মার্কিন কৌশলগত পছন্দের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করুক। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকবিরোধী যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।

মাদক পাচারের অভিযোগ কতটা সত্য: ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলাকে ‘নারকো-সন্ত্রাসী’ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ফেন্টানিল সংকটের সঙ্গে কারাকাসের প্রায় কোনো সংযোগ নেই। কোকেন পাচারের ক্ষেত্রেও ভেনেজুয়েলা প্রধান উৎপাদক বা প্রধান পাচারকারী নয়, তাদের বেশিরভাগ কোকেন ইউরোপে যায়।

বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া: মার্কিন মিত্র দেশগুলোও ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারো বলেছেন, হামলাগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো ট্রাম্পকে ‘বর্বর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকে ‘নিঃসন্দেহে ল্যাটিন আমেরিকার বিরুদ্ধে আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা বলেছেন, অন্য কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট (ভেনেজুয়েলা) কেমন হবে, তা নিয়ে অনুমান করা উচিত নয়। রাশিয়া হামলার নিন্দা জানিয়ে একে ‘নীতিহীন দেশের’ কাজ বলে অভিহিত করেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মাদুরোকে লেখা এক চিঠিতে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘বাহ্যিক শক্তির হস্তক্ষেপের’ দৃঢ় বিরোধিতা করেছেন।

ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব: আমেরিকাকে  মহান করার স্লোগানের ভিত্তিতে ক্ষমতায় ফেরা ট্রাম্পের অনেক সমর্থকই ব্যয়বহুল বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপে অনাগ্রহী। তবে ফ্লোরিডায় অবস্থিত কিউবান ও ভেনেজুয়েলান অভিবাসীদের সমর্থন ধরে রাখতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতো নেতারা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কঠোর নীতি বজায় রাখতে চাপ দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘মিউনিজম-বিরোধিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার’প্রতিশ্রুতিকে একসূত্রে বাঁধে। ফেইন সতর্ক করেছেন, ভেনেজুয়েলায় সরাসরি আক্রমণ ট্রাম্পের জন্য একটি দর কষাকষির কৌশল এবং একইসঙ্গে একটি বাস্তব বিকল্পও বটে। যা বাস্তব পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে।

বাংলাদেশ সময়: ০:০২:০০   ৮০ বার পঠিত  




আন্তর্জাতিক’র আরও খবর


‘জখম বা হাড় না ভাঙা’ পর্যন্ত স্ত্রীকে প্রহার বৈধ করেছে তালেবান
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও অনিশ্চয়তা রমজানের আনন্দ খুঁজে ফিরছে গাজাবাসী
পবিত্র আল-আকসার ইমামকে গ্রেপ্তার করল ইসরাইলের পুলিশ
বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার যুক্তরাজ্যের
শান্তিপূর্ণ দেশ গড়তে পূর্ণ সমর্থন দেবে জাতিসংঘ
তারেক রহমানের বিজয়কে যেভাবে দেখছে ভারতীয় মিডিয়া
বিশ্বগণমাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যা বলা হলো
তারেক রহমানকে ঐতিহাসিক বিজয়ের শুভেচ্ছা, কাজ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র
ভারতের মিডিয়ায় বাংলাদেশের নির্বাচনের লাইভ সম্প্রচার চলছে
বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের কড়া নিন্দা চীনের

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ