বড় বাজেট বড় ঘাটতি,ঋণ নির্ভরতা বাড়ছে

প্রথম পাতা » জাতীয় » বড় বাজেট বড় ঘাটতি,ঋণ নির্ভরতা বাড়ছে
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬



বড় বাজেট বড় ঘাটতি,ঋণ নির্ভরতা বাড়ছে

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বড় বাজেটের ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছরের মতো এবারো ব্যাংক খাত থেকেই ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। আগামী অর্থবছরের বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেয়া হবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে। রেকর্ড ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা বাজেট বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে অর্থের সংস্থানকে বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব এক পর্যালোচনায় চ্যালেঞ্জের উল্লেখ করা হয়েছে।

আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করবেন। প্রথম বাজেটে বিএনপি সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর নানা উদ্যোগ থাকবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, অর্থনীতিকে পুনরায় প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থমন্ত্রী নিজেই সমপ্রতি সচিবালয়ে বলেছেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই বড় বাজেট করতে হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে মোট ঘাটতি হবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩.৬ শতাংশের সমান। ঘাটতি অর্থায়নের জন্য বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ- দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈদেশিক উৎস থেকে নিট ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নিট ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার তুলনায় কিছুটা কম। এরপরও বাজেটে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবেই থাকছে ব্যাংক খাত। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে সরকার শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যের মধ্যে থাকতে পারেনি। যে কারণে সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে।

আগামী অর্থবছরে ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক-বহির্ভূত ঋণের পরিমাণ কমবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে মোট ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ৫ হাজার কোটি টাকার অনুদান। তবে ঋণ পরিশোধ বাবদ ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়ায় নিট বৈদেশিক অর্থায়ন দাঁড়াবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে নিট বৈদেশিক অর্থায়নের লক্ষ্য ছিল ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। অবশ্য প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। কিন্তু বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ না পাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।

ঋণের সুদ পরিশোধ বড় ব্যয়; প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। তবে আগামী অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যদিও পরিমাণে সামান্য বেশি, তবুও এটি দেশের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোর ওপর ঋণজনিত চাপেরই প্রতিফলন।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশ। ফলে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোই আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থায়নই বড় চ্যালেঞ্জ: অর্থ বিভাগের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে একসঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দেয়া, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ সঞ্চালন নিশ্চিত করা, ঋণ ধারণ সক্ষমতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। অর্থ বিভাগ মনে করছে, কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চাপও বাজেট ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকি খরচ মেটানোর পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যদি দেখা যায় বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে, তাহলে সরকারের উচিত হবে ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করা। এক্ষেত্রে সিকিউরিটাইজেশন, বৈদেশিক ঋণ বা অন্যান্য অর্থায়ন উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি এবং প্রত্যাশিত বিদেশি বাজেট সহায়তা না পাওয়ায় সরকারকে ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এ ধরনের নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ সময়: ৮:১৮:৫২   ১২৫ বার পঠিত  




জাতীয়’র আরও খবর


নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ, নিরাপত্তা ও আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা
কেবিন ক্রুদের ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্সে হুন্ডির অভিযোগ, তদন্তে বিমান কর্তৃপক্ষ
আওয়ামী লীগের শাসনামলের গুম-খুন ট্রাইব্যুনালে তিন মামলার রায় চলতি বছরেই হতে পারে
রোববার বঙ্গভবন ছাড়ছেন মো. সাহাবুদ্দিন
পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি যে অবসরভাতা ও সরকারি সুবিধা পাবেন
লিগ্যাল এইডের এডিআরের মাধ্যমে ২ লাখ ১১৪৪১ মামলার নিষ্পত্তি
মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম আশাব্যঞ্জক ফল দিচ্ছে : আইনমন্ত্রী
জুস, শ্যাম্পু, আইসক্রিম, লোশনসহ ৮ ধরনের পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ বিএসটিআইয়ের
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলা গ্রেপ্তার মেজর মোজাফফরের বিচার হবে সামরিক আদালতে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সরকার চায় রাষ্ট্রের ব্যয় কমাতে এয়ারশো দেখতে বিদেশে বিমানের শীর্ষ ৫ কর্তা

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ