ধর্ষণ মামলার দ্রুত তদন্তে বাধা মেডিকেল রিপোর্ট

প্রথম পাতা » জাতীয় » ধর্ষণ মামলার দ্রুত তদন্তে বাধা মেডিকেল রিপোর্ট
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬



ধর্ষণ মামলার দ্রুত তদন্তে বাধা মেডিকেল রিপোর্ট

জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় বিলম্বিত বিচার হলো বিচার অস্বীকার করারই নামান্তর। অর্থাৎ একজন ভুক্তভোগী যদি সঠিক সময়ে আইনি প্রতিকার না পান, তবে সেই বিচার না পাওয়ার মতোই অর্থহীন। বাংলাদেশের অধিকাংশ ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে এই আইনি প্রবাদটি মিলে যাচ্ছে। তবে অতি সম্প্রতি পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার রায় দেখিয়ে দেওয়া হলো, রাষ্ট্রযন্ত্র চাইলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার সম্ভব।

তবে আইনে তদন্ত শেষ করার জন্য ৩০ কার্যদিবস বেঁধে দেওয়া আছে। কিন্তু মেডিকেল ও ডিএনএ রিপোর্টের জন্য মামলার তদন্ত ঝুলে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয় না। ফলে পিছিয়ে যাচ্ছে বিচারও। ১০টি ধর্ষণ মামলার নথি বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

দেখা গেছে, অধিকাংশ মামলার তদন্ত বিলম্বের অন্যতম কারণ মেডিকেল রিপোর্ট না পাওয়া। অনেক সময় রিপোর্ট পেতে ১২ মাস পার হয়ে যায়। এ সংক্রান্ত মামলার ৫ জন তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে গণমাধ্যম। তারা জানান, ধর্ষণ মামলায় মেডিকেল রিপোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ। ভুক্তভোগীর শরীরে যৌন নির্যাতনের আলামত, আঘাতের চিহ্ন, ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য যাচাইয়ের জন্য এ রিপোর্ট প্রয়োজন। আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের সময়ও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বিষয়ে ফরেনসিক সংশ্লিষ্টরা সরাসরি বক্তব্য দিতে রাজি না হলেও তারা জানান, ভুক্তভোগীকে পরীক্ষার পর মেডিকেল বোর্ডের মতামত, আলামত পরীক্ষার ফল এবং ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন একত্র করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় চলে যায়। বিশেষ করে ফরেনসিক পরীক্ষাগারে মামলার চাপ বেশি থাকায় রিপোর্ট দিতে বিলম্ব হয়। লোকবল সংকট তো আছেই।

কেস স্টাডি-১ : রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানায় ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল এক কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন তার বাবা। এজাহারে বলা হয়, সাততলা বাড়ির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে অভিযুক্ত যুবক কিশোরীকে কৌশলে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও পিরোজপুরে নিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে। ছয় দিন পর পুলিশ কিশোরীকে উদ্ধার এবং প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। একপর্যায়ে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ২৪ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে আবেদন করে ভিকটিমের সংরক্ষিত ডিএনএ নমুনার সঙ্গে গ্রেফতার আসামির ডিএনএ তুলনামূলক পরীক্ষার অনুমতি চান। আদালতের নথি অনুযায়ী, ভিকটিম ও আসামির ডিএনএ প্রোফাইল প্রস্তুত করে বিশেষজ্ঞ মতামত পাওয়ার আগে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল সম্ভব নয়। ইতোমধ্যেই ১২ মাস পার হয়ে গেছে। এখনো মেডিকেল ও ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তও শেষ হয়নি।

কেস স্টাডি-২ : ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর কামরাঙ্গীরচর থানায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলা করেন তার মা। মায়ের কর্মস্থলে যাওয়ার পথে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটিকে প্রলোভন দেখিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। মামলার প্রায় ২৫ দিন পর ৯ জানুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে আবেদন করেন অভিযুক্তের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার অনুমতির জন্য। আবেদনে বলা হয়, ভিকটিমের নমুনার সঙ্গে আসামির ডিএনএ তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞ মতামত পাওয়া প্রয়োজন। ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি, নমুনা সংগ্রহ, ল্যাব বিশ্লেষণ এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে সাত মাস পার হয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি তদন্ত কর্মকর্তা।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ধর্ষণসহ মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার চাহিদা অনেক বেড়েছে। দেশে ডিএনএ ল্যাব ও জনবল এখনো অপ্রতুল। ফলে জট তৈরি হচ্ছে, এর প্রভাব পড়ছে তদন্ত কার্যক্রমেও।

তিনি বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। তদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা, প্রসিকিউশন ও বিচারিক পর্যায়ে কোথায় কী সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে সমাধান করতে হবে। অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিচারক, তদন্ত কর্মকর্তা ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও বৃদ্ধি করতে হবে। তা না হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা কঠিন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন ধর্ষণ মামলার তদন্তে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু মেডিকেল রিপোর্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ধর্ষণ মামলায় শুধু ডিএনএ বা মেডিকেল রিপোর্টের ওপর নির্ভরশীল হলে অনেক ক্ষেত্রে বিচার বিলম্বিত হতে পারে। তিনি বলেন, মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে ভিকটিমের শরীরে আঘাত বা নির্যাতনের চিহ্ন আছে কি না, তা নির্ণয় করা সম্ভব। ডিএনএ প্রমাণ না মিললেও শরীরে আঘাতের চিহ্ন, পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ এবং সাক্ষ্য যদি যৌন সহিংসতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেগুলোকেও বিচারিক মূল্যায়নের আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশ সময়: ৮:১২:৪৯   ১১২ বার পঠিত  




জাতীয়’র আরও খবর


জুস, শ্যাম্পু, আইসক্রিম, লোশনসহ ৮ ধরনের পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ বিএসটিআইয়ের
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলা গ্রেপ্তার মেজর মোজাফফরের বিচার হবে সামরিক আদালতে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সরকার চায় রাষ্ট্রের ব্যয় কমাতে এয়ারশো দেখতে বিদেশে বিমানের শীর্ষ ৫ কর্তা
ই-পাসপোর্টে যুক্ত হচ্ছে আবু সাঈদ-মুগ্ধ-ওয়াসিমের ছবি
আন্তঃদেশীয় অপরাধ সম্মেলনে যোগ দিতে থাইল্যান্ডের পথে আইজিপি
আইনি কাঠামোর মধ্যেই শেখ হাসিনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে : আইনমন্ত্রী
১০ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা সরকারের
সংসদে প্রধানমন্ত্রী সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আসছে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’
মেট্রো রেলের নিরাপত্তায় ৮ দফা জরুরি সুপারিশ
সাইবার সুরক্ষা আইনে কী কী পরিবর্তন এলো?

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ