
পদচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নৃশংস শাসনামলে সংঘটিত সব জোরপূর্বক গুমের জবাবদিহিতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিবার ও বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের দিতে হবে ক্ষতিপূরণ। অন্তর্বর্তী সরকারের গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এমন দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ফোর্টিফাই রাইটস। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্কুপ।
ফোর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি বলেন, গুম ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং বাংলাদেশে আর কখনো তা ঘটতে দেয়া উচিত নয়। কমিশনের প্রথম বছরে দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণে কিছু অগ্রগতি হলেও সরকারকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। ন্যায্য ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। স্কুপ আরও লিখেছে, ২০২৪ সালের ২৭শে আগস্ট বাংলাদেশ সরকার গুমের হাজারো ঘটনার তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন করে। একই মাসে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসন্স ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপেয়ারেন্সে স্বাক্ষর করে। ইতিমধ্যে কমিশন ১৮ শতাধিক গুমের মামলা গ্রহণ করেছে এবং শত শত মানুষের এখনও নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কমিশন আংশিক চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয় শেখ হাসিনার আমলে গুম ছিল ‘কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় পরিচালিত একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া।’ ২০২৫ সালের জুনে সরকার কমিশনের মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত করে। ফোর্টিফাই রাইটস ১০ জন গুম থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তি, ভুক্তভোগীর স্বজন এবং তাদের সহায়তাকারী একজন আইনজীবীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
দু’জন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তারা ‘আয়নাঘর’নামে কুখ্যাত গোপন আটককেন্দ্রে বন্দি ছিলেন এবং শেখ হাসিনার পতনের পর মুক্তি পান। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুম হওয়া অনেকেই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর। মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান) একজন আইনজীবী। ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট ঢাকায় নিজের বাড়ি থেকে পরিচয়হীন লোকেরা তার স্ত্রী ও সন্তানের সামনে থেকে তাকে তুলে নেয়। তিনি ছিলেন তার পিতা মীর কাসেম আলীর পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আইনজীবী দলের সদস্য। ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সরকার ২০১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার ফাঁসি কার্যকর করে। আরমান প্রায় নয় বছর গোপন, বিচারবহির্ভূত আটক অবস্থায় থাকার পর ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট মুক্তি পান শেখ হাসিনার দেশত্যাগের এক দিন পর। তিনি জানান, সেই সেলে আমি বুঝতেই পারতাম না দিন না রাত। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আমাকে চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে রাখা হতো। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত হাত পেছনে বেঁধে রাখত। সেলের আকার ছিল আট বাই ১০ ফুট। জানালা ছিল না। বাইরের শব্দ ঢাকতে ভারি এক্সাস্ট ফ্যান চালানো হতো। এটা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ ছিল। দীর্ঘ সময় হাতকড়া পরে থাকার ফলে তার কব্জিতে ঘা হয়। তখন প্রহরীরা যে মলম দেয়, তার প্যাকেটে লেখা ছিল ‘র্যাব-১’। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
আরমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, ন্যায্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য একটি শক্তিশালী ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি চালু করতে। ফোর্টিফাই রাইটস আরও কিছু নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। বিএনপি কর্মী আব্দুল কাদের মাসুম ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর র্যাবের হাতে ধরা পড়েন। তার মা আয়েশা আলী জানান, ১৬ ডিসেম্বর আমার ছেলের জন্মদিন। তার দু’দিন আগে রাতে ফোন পাই। ফোনে ছেলে বলল, মা, কেমন আছ? এরপর শুনলাম, মা, ওরা আমাকে মারছে। কলটি ২৩ সেকেন্ড স্থায়ী হয়, তারপর কেটে যায়। এরপর আর কোনো খোঁজ পাইনি। আয়েশা বলেন, কখনও মনে হয়, মৃত্যুই হয়তো এ কষ্টের চেয়ে ভালো। ছাত্রদল কর্মী কাওসার হোসেন ২০১৩ সালে ঢাকা থেকে গুম হন। এখনও নিখোঁজ। তার মেয়ে তখন তিন বছরের। এখন তার বয়স ১৫ বছর। তিনি বলেন, আমি বাবার হাত ধরতে চাই। আমি তাকে বাবা বলে ডাকতে চাই। সত্য জানার অধিকার আমার আছে। সানজিদা ইসলাম তুলির ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ২০১৩ সালে গুম করা হয়। এখন ‘মায়ের ডাক’ নামে ভুক্তভোগীদের পরিবারভিত্তিক সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সানজিদা। তিনি বলেন, বছরের পর বছর একই ধারা- বিরোধী দলের কর্মীদের তুলে নিয়ে যাওয়া, আটক, নির্যাতন ও হত্যা চলেছে। র্যাব, গোয়েন্দা, সেনাবাহিনী- সবাই জড়িত ছিল। প্রতিটি ঘটনার নিষ্পত্তি চাই। ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তায় আর্থিক ক্ষতিপূরণ অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, গুমকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা রাষ্ট্রের অনুমোদনে বা সহযোগিতায় কাউকে আটক, অপহরণ বা স্বাধীনতা হরণ করে তার ভাগ্য ও অবস্থান গোপন করা, যা তাকে আইনের সুরক্ষার বাইরে ঠেলে দেয়। কনভেনশনের ২৪ নং অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেয়- সব নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা, জীবিতদের মুক্তি দেয়া এবং মৃতদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে দিতে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীদের ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপেয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রিড্রেস অর্ডিন্যান্স’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে। তবে এতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান এবং অনুপস্থিতিতে বিচারের মতো গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। যদিও খসড়ায় ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে এবং একটি ভুক্তভোগী তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। ফোর্টিফাই রাইটস বলছে, খসড়ায় অবশ্যই ক্ষতিপূরণের ধারা থাকতে হবে, তবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ও অনুপস্থিতিতে বিচার বাতিল করতে হবে। দাতা রাষ্ট্রগুলোর বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা উচিত। ২০২৫ সালের ১৫ মে ১১টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, ফোর্টিফাই রাইটসসহ, যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, খসড়া অধ্যাদেশে মৃত্যুদণ্ডকে শাস্তির বিকল্প হিসেবে রাখা উচিত নয়। জাতিসংঘের তদন্ত মিশন (ফেব্রুয়ারি ২০২৫) বাংলাদেশ সরকারকে সুপারিশ করে যে, গোপন আটককেন্দ্রগুলো প্রকাশ ও বন্ধ করা, অপরাধীদের বিচার করা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস ২০২৫ সালের জুনে প্রতিবেদনে বলেছে, ভুক্তভোগীদের বিচারপ্রাপ্তি, আইনি ও আর্থিক সহায়তাসহ বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ সময়: ১০:২৯:১৯ ৪৩ বার পঠিত