
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভ দমনে ব্যর্থ হয় বা বাহিনীর সদস্যরা আদেশ অমান্য করে পালিয়ে যায়, সে পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়ার জন্য তার বিকল্প পালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বৃটিশ পত্রিকা দ্য টাইমসকে শেয়ার করা এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। তবে মিডিয়ার এ খবরের বিষয়ে খামেনি, ইরান বা ইরানি কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, যদি ৮৬ বছর বয়সী খামেনি দেখেন যে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমনে দায়িত্ব পালন থেকে সরে যাচ্ছে বা আদেশ মানছে না তাহলে তিনি নাকি ঘনিষ্ঠ ২০ জন সহযোগী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তেহরান ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
এক গোয়েন্দা সূত্র দ্য টাইমসকে জানায়, এই ‘প্ল্যান বি’ মূলত খামেনি এবং তার খুব ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য। এর মধ্যে তার ছেলে ও মনোনীত উত্তরসূরি মুজতবাও আছেন।
দ্য টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থায় বহু বছর কাজ করা এবং ইসলামি বিপ্লবের আট বছর পর ইরান থেকে পালানো বেনি সাবতি বলেন, খামেনির জন্য পালানোর একমাত্র নিরাপদ স্থান মস্কো: ‘তার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।’ তিনি আরও বলেন, খামেনি ‘পুতিনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ রাখেন এবং ইরানি সংস্কৃতি রুশ সংস্কৃতির কাছাকাছি।’
এই পরিকল্পনার আদলে রয়েছে তার মিত্র সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের দেশত্যাগ। আসাদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিরোধী বাহিনী রাজধানীতে ঢোকার আগে পরিবারসহ মস্কোয় চলে যান। সূত্রের ভাষায়, ‘তারা তেহরান ছাড়ার একটি পালানোর পথ নির্ধারণ করেছে,’ যার মধ্যে রয়েছে ‘বিদেশে সম্পদ ও সম্পত্তি জোগাড় করা এবং নিরাপদ প্রস্থানের জন্য নগদ অর্থ সুরক্ষিত রাখা।’
খামেনির নিয়ন্ত্রণে বিপুল সম্পদের একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর বড় অংশ রয়েছে ‘সেতাদ’ নামের শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে, যা আধা রাষ্ট্রীয় দাতব্য কাঠামোর অংশ এবং আর্থিক গোপনীয়তার জন্য পরিচিত। রয়টার্সের ২০১৩ সালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের হিসেবে এসব সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার।
তার ঘনিষ্ঠ অনেক সহকারী, যার মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক সচিব আলী লারিজানিও আছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের একজনের বেশি বিদেশে বসবাস করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ইরানের বিভিন্ন শহরে, এমনকি পবিত্র নগরী ক্বোমেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করছেন, দমনমূলক বাহিনী গুলি, টিয়ারগ্যাস ও ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করছে। এসব বাহিনীর মধ্যে আছে আইআরজিসি, বাসিজ, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। এই বাহিনীগুলো পুরোপুরি খামেনির নির্দেশে পরিচালিত হয়। কারণ তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন ব্যক্তি। তিনি আইআরজিসির ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেন।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী আদেশ মানছে না বা ভেঙে পড়ছে- এমন ইঙ্গিত পেলে খামেনি এই পালানোর পরিকল্পনা সক্রিয় করবেন। যদিও তার নিয়ন্ত্রণে থাকা পদায়ন ও বিশ্বস্ততার কাঠামোর কারণে দলত্যাগ সহজ নয়। একই মূল্যায়নে আরও বলা হয়, গত বছরের ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে খামেনি ‘মানসিক ও শারীরিকভাবে দুর্বল’ হয়ে পড়েছেন। যুদ্ধকালীন তিনি একটি বাঙ্কারে অবস্থান করেন এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভ চলাকালে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। প্রতিবেদন তাকে ‘প্যারানয়েড’ স্বভাবের নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছে- যা তার আত্মরক্ষামূলক মনোভাব ও দেশত্যাগের পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করেছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, তিনি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনে কৌশলগত আপস করতে সক্ষম।
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেয়া খামেনি তরুণ বয়সে সাহিত্য, সঙ্গীত ও কবিতার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। শাহ আমলের বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি কয়েক দফা গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন এবং ১৯৮১ সালের এক হত্যাচেষ্টায় তার এক হাতের ব্যবহার হারান। পরে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পরিষদের সদস্য হন এবং খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার পদে আসীন হন। তিনি নিজেকে বিশ্বব্যাপী শিয়া মুসলমানদের নেতা মনে করেন এবং হিজবুল্লাহ, হামাস, ও ইরাক-সিরিয়া-ইয়েমেনের শিয়া গোষ্ঠীগুলোর প্রতি বিনিয়োগকে তার অংশ হিসেবে দেখেন। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এসব ‘বহির্মুখী বিনিয়োগ’ নিয়ে ইরানিদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে, যখন দেশবাসী মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার অবনতিতে ভুগছে।রাস্তায় শোনা গেছে একটি স্লোগান: ‘গাজায় না, লেবাননে না- আমার জীবন শুধু ইরানের জন্য।’
বাংলাদেশ সময়: ৩:২৮:৩০ ৫৮ বার পঠিত