গণ-অভ্যুত্থানের ১ বছর গতি ফেরেনি রাজধানীর থানাগুলোতে

প্রথম পাতা » প্রধান সংবাদ » গণ-অভ্যুত্থানের ১ বছর গতি ফেরেনি রাজধানীর থানাগুলোতে
সোমবার, ৪ আগস্ট ২০২৫



গতি ফেরেনি রাজধানীর থানাগুলোতে

গত বছরের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর বেপরোয়া গুলি করে গণহত্যা চালিয়েছিল পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের দিন মানুষের ক্ষোভের কেন্দ্র ছিল অনেক থানা। মানুষ থানায় আগুন দেয় এবং অস্ত্র লুট করে। থানাগুলোতে অবস্থান করা পুলিশ সদস্যদের অনেক স্থান থেকে উদ্ধার করতে হয় অন্য বাহিনীকে। অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থানাগুলো সংস্কার, পুলিশকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু অভ্যুত্থানের এক বছরের মাথায়ও গতি ফিরেনি পুলিশের কাজে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের দমনপীড়নের ট্রমা থেকে বের হতে পারছেন না অনেক পুলিশ সদস্য। কেউ আবার বিচারের কাঠগড়ায়। গণ-অভ্যুত্থানের বছরপূর্তির সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন থানা ঘুরে দেখা গেছে ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের চিহ্ন মুছে আগের চেহারায় ফিরেছে থানাগুলো। কিন্তু অধিকাংশ জনবল ঢাকার বাইরে থেকে আসা। দায়িত্বপ্রাপ্তরাও অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন।

গত বছরের ৫ই আগস্ট ও পরদিন ৬ই আগস্ট দেশের প্রায় ৪ শতাধিক থানায় হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। সেদিনের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঢাকা মেট্রোপলিটনের অন্তত ২১টি থানা। টেবিল-চেয়ার, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, জব্দকৃত আলামতসহ আগুনে পুরোপুরি ধ্বংস হয় মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, যাত্রাবাড়ীসহ ডিএমপি’র ১৪টি থানা ভবন। পুড়ে যায় হাজার হাজার মামলার নথি। শুধু মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, আদাবর, পল্টন ও ওয়ারী এই ৬ থানায় আগুনে প্রায়  ১ হাজার ২২৬টি মামলার নথিপত্র পুড়ে যায়। বাকি যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, ভাটারা, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, খিলগাঁও ও খিলক্ষেত থানায় যে কতো নথিপত্র আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে তার কোনো হদিসই পাওয়া যায়নি। জনরোষে সেদিন অস্ত্র-গোলাবারুদ এমনকী গায়ের পোশাক খুলে থানা থেকে পালাতে বাধ্য হন পুলিশ সদস্যরা। আত্মগোপনে চলে যান প্রশাসনের সকলে। দেশ জুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। ডাকাত আতঙ্কে মহল্লায় মহল্লায় রাত জেগে পাহারার ব্যবস্থা করে খোদ সাধারণ বাসিন্দারাই। সরকার গঠনের পর পুলিশ প্রধান, ডিএমপি কমিশনারসহ নিয়োগ দেয়া হয় পুলিশ কর্মকর্তাদের। নানা চড়ায়-উতরায়ের পর নাগরিকদের সঙ্গে মিটিং, ক্যাম্পিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে পোড়া থানায় আসতে থাকে পুলিশ সদস্যরা। তবে তখনো নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিতেন না কেউই। প্রাণভয়ে পুলিশি পোশাক কেউ গায়ে জড়ায়নি তখন। সেনা সদস্যদের নিরাপত্তায় থানার বাইরে ব্যাঞ্চে বসে ডিউটি করে নীরবে বাসায় ফিরে গিয়েছেন। অনেক ডিউটি শেষে ব্যাগে করে পোশাক বহন করতেন। থানা সংস্কারের পরে আগস্টের মাঝামাঝি থেকে ধীরে ধীরে কার্যক্রম শুরু হয় সকল থানার। ঘটনার এক বছরের মাথায় দেশের সকল থানায় আবারো স্বাভাবিকভাবে পুলিশি কার্যক্রম চলছে।

তবে মো. ইয়াসিন আহমেদ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, পুলিশ যে কতো ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল তা গত ১৭ বছরে এদেশের মানুষ দেখেছে। কিন্তু পুলিশ যখন থানায় ছিল না তখন আমরা পুলিশের গুরুত্ব বুঝেছি। সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। তিনি বলেন, থানা পুড়িয়ে দেয়ার পর বিভিন্ন প্রচেষ্টার পর পুলিশ সদস্য থানায় ফিরে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তাদের মধ্যে আগের সেই অবস্থা চোখে পড়ছে না। আগে রাত ২/৩টার সময় বাসা থেকে বের হতে ভয় লাগতো না। কিন্তু এখন রাত ১১টা বাজলেই ঢাকা শহরে রাস্তায় বের হতে চিন্তা হয়। ছিনতাই-চুরি আগের থেকে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোড়ে মোড়ে চাঁদাবাজি চলছে। দিনের আলোতে সকলের সামনে রাস্তার ওপর মানুষকে পাথর দিয়ে পিটিয়ে মাথা থেঁতলে খুন করা হচ্ছে। পুলিশ আসামি ধরছে কিন্তু ঘটনা ঘটনার পর। তিনি বলেন, পুলিশ যদি পূর্ণ গতি নিয়ে কাজ করতো তাহলে এসব নির্মমতা করা তো দূরের কথা কেউ এসব করার চিন্তাও করতে সাহস পেতো না।

সাজ্জাদ হোসেন নামে মোহাম্মদপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, আগে পুলিশ বাড়িতে বা এলাকায় আসলে মানুষের মধ্যে এক আতঙ্ক বিরাজ করতো। আর এখন ভ্যানওয়ালা-রিকশাওয়ালারাও পুলিশ সদস্যদেরকে হুমকি দেয়। আসামি ধরতে গেলে পুলিশ সদস্যদেরকেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেয়। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগেই ফকিরাপুলে মাদক কারবারিদের আটক করতে গিয়ে তিন পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পর্যন্ত তাদেরকে দেখতে যান। তিনি বলেন, এখন এমন একটা অবস্থা, গুঁড়ো থেকে বুড়ো, ভবন মালিক থেকে ডিম ব্যবসায়ী সকলের কাছেই আগ্নেয়াস্ত্র থাকে। কেউ কিছু বললেই গুলি চালিয়ে দেয়। দিনে দুপুরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মানুষকে খুন করে ফেলছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার আগেই অপরাধীর পক্ষে তদবির করতে থানায় লোক চলে যাচ্ছে।  এই পুলিশ সদস্যরা আবারো আগের মতো বিভিন্ন অসৎ উপায় অবলম্বন করছে। তাই বর্তমানে হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া বেশির ভাগ মানুষই নাগরিকসেবা থেকে বঞ্চিত।

এসব বিষয় নিয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান বলেন, আামি গত বছরের ২৪শে জুলাই এই থানায় যোগদান করি। যখন আমাকে এই থানার দায়িত্ব দেয়া হয় তখন এই ভবনে বসে কাজ করার মতো জায়গা ছিল না। থানা ভবন ছিল আগুনে পোড়া কঙ্কাল। আবর্জনার স্তূপ। থানার গাড়ি থেকে শুরু করে সব পুড়িয়ে দেয়া হয়। অস্ত্র লুট করা হয়। কোনো কিছু অবশিষ্ট ছিল না। প্রায় মাসখানেক থানা ভবনে কেউ ঢুকতে পারেনি। সেই অবস্থা থেকে সকলের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে আজকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে থানা। পোড়া দেয়ালে রঙ করানো হয়। দর্শনার্থীদের বসার জন্য চেয়ার-টেবিল, কম্পিউটার, ফটোকপি মেশিন, ফাইল কেবিনেট, নতুন পর্দা দিয়ে সাজানো হয়েছে থানা ভবনকে। আমরা পুরো ফোর্স নিয়ে মানুষকে পূর্ণগতি নিয়ে পুলিশি সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

এদিকে, গত ৫ই আগস্ট সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়া থানাগুলোর মধ্যে অন্যতম মিরপুর মডেল থানা। থান ভবন পুড়িয়ে দেয়ায় দীর্ঘদিন থানার পেছনে কোয়ার্টারে পুলিশি কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ওসি থেকে শুরু করে সকলেই ওই কোয়ার্টারে অফিস করেছেন। গতকাল গিয়ে দেখা যায়, সামনের থানা ভবন নতুনভাবে সাজিয়ে অফিসারদের রুম, হাজতখানাসহ সকল ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাদা রংয়ের আঁচড় দেয়া হয়েছে পুরো থানায়। তবে থানার পেছনে এখনো পুড়ে যাওয়া গাড়িগুলো সেদিনের স্মৃতি বহন করে আছে আজও। মিরপুর থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজ্জাদ রোমন বলেন, ঢাকাসহ দেশের যেসব থানা সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যায় তার মধ্যে আমাদের মিরপুর অন্যতম। গত বছর আমাদের থানার গাড়ি থেকে শুরু করে আসবাবপত্র, কম্পিউার, থানা ভবন সব পুড়িয়ে দেয়া হয়। অস্ত্র-গোলাবারুদ লুট করা হয়। সেইসব স্মৃতি ভুলে আমরা নতুন উদ্যমে কাজ করে যাচ্ছি। পুলিশের গতি ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, টহলের পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন মামলা ও অপরাধে সংশ্লিষ্ট আসামি আটক করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ঢাকার বাইরেও অভিযানে যাচ্ছে আমাদের পুলিশ সদস্যরা। সর্বপরি আমাদের থানা পুলিশ নিজের সাধ্যমতো মানুষের সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, জুলাই বিপ্লবের সময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও আলোচিত ছিল যাত্রাবাড়ী থানা। গত ৫ই আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যাত্রাবাড়ী থানা কমপ্লেক্সে হামলা, লুটপাট করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহতের পাশাপাশি অন্তত ৪০ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন হয়। থানাটির ৭টি গাড়ি, তৎকালীন একজন এসি ও এডিসি’র গাড়িসহ মোট ৯টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ ছাড়া বাইরে থেকে আসা পুলিশ সদস্যদের গাড়িগুলোও সেদিন আগুনে পুড়ে যায়। থানার ভেতরে থাকা পুলিশ সদস্যদের মোটরসাইকেল, আলামত হিসেবে জব্দ করে আনা গাড়িও পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ ছাড়া থানার পূর্ব পাশে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ভবনের সামনে থানার অন্তত ৩৫টি গাড়ি রাখা ছিল, সেগুলোও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে  দেয়া হয়। আগুনের কারণে থানার রেজিস্টার, মামলার নথি, কম্পিউটার সবকিছুই পুড়ে যায়। তবে এখনো পেছনের দোতলা ভবন বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ওই বিধ্বস্ত ভবন দেখলে সেদিনের চিত্র এখনো ভেসে ওঠে স্থানীয়দের। থানাটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, আমরা আর সেসব দিনের কথা মনে করতে চাই না। সেই পুড়ে যাওয়া থানা ভবন সংস্কার করে নতুন করে সাজানো হয়েছে। টহল গাড়ি, কম্পিউটার, আসবাবপত্র সব নতুন করে যোগ করা হয়েছে। আপাতত তেমন কোনো সমস্যা নেই। মামলা, জিডি, টহল, অভিযান, অপরাধী আটক, গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে বর্তমানে আমরা আমাদের সকল পুলিশিং কার্যক্রম চালু রেখেছি। সাধারণ মানুষকে আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে সেদিনের ঘটনা নিয়ে এখনো অনেকে ট্রমাটাইজড হয়ে রয়েছেন বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস্‌ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, আমাদের পুলিশ সদস্যরা আগের চেয়ে অনেক পেশাদার হয়েছে। তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করছে।  তারা আগের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর বাইরে ডিএমপি’র ৫০টি থানা এলাকায় নিয়মিত টহল টিম এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে  চেকপোস্ট পরিচালিত করা হচ্ছে। এরই প্রেক্ষিতে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়াও সম্প্রতি যে আলোচিত ঘটনাগুলো ঘটেছে- তার বেশির ভাগেরই রহস্য উদ্‌ঘাটনে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।

বাংলাদেশ সময়: ২:৩৯:০৪   ৭৬ বার পঠিত  




প্রধান সংবাদ’র আরও খবর


অপারেশন সিঁদুর নিয়ে ভারতের নতুন তথ্য ৫০টিরও কম অস্ত্র ব্যবহার করেই সংঘাতের অবসান
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘আফটার দ্য হান্ট’
ইসরাইলের জন্য আকাশ সীমা বন্ধ করলো তুরস্ক
দাবি রাশেদের লাল টিশার্ট পরিহিত সেই ব্যক্তি পুলিশের কনস্টেবল মিজানুর রহমান
নুরের ওপর হামলার নিন্দা ও তদন্তের নিশ্চয়তা প্রেস সচিবের
নুরের ওপর হামলা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ: অ্যাটর্নি জেনারেল
জরুরি বৈঠকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
কাকরাইলে সংঘর্ষ নিয়ে সেনাবাহিনীর ব্যাখ্যা
নুরুল হকের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা
কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ২১, ট্রাম্প বললেন ‘অবাক হইনি’

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ