আল জাজিরার বিশ্লেষণ কেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের কাছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রি করছে পাকিস্তান?

প্রথম পাতা » আন্তর্জাতিক » আল জাজিরার বিশ্লেষণ কেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের কাছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রি করছে পাকিস্তান?
সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬



কেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের কাছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান  বিক্রি করছে পাকিস্তান?

নতুন বছরের এক সপ্তাহও পেরোয়নি। এর মধ্যেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধু এবং বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর প্রধান মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের মধ্যে বৈঠকের পর ইসলামাবাদ ইঙ্গিত দিয়েছে, বাংলাদেশের কাছে তাদের নিজস্বভাবে উৎপাদিত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির একটি চুক্তি শিগগিরই বাস্তব রূপ নিতে পারে।পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ দপ্তর আইএসপিআর জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর পুরনো যুদ্ধবিমান বহর আধুনিকায়ন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি সংযুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তান দ্রুতগতিতে ‘সুপার মুশশাক’ প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহের আশ্বাস দেয়। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়েও ‘বিস্তারিত আলোচনা’ হয়েছে।

সুপার মুশশাক একটি হালকা প্রশিক্ষণ বিমান, যা মূলত নতুন পাইলটদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান ছাড়াও আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান ও ইরাকসহ অন্তত ১০টির বেশি দেশ এই বিমান ব্যবহার করছে।বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার পরদিনই আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করছে। বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর কয়েক মাস আগেই দুই দেশ একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।এর আগে, ডিসেম্বরের শেষ দিকে খবর আসে যে, পাকিস্তান লিবিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) সঙ্গে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের একটি সামরিক চুক্তিতে পৌঁছেছে, যেখানে এক ডজনেরও বেশি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে লিবিয়া বা সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চুক্তি নিশ্চিত করেনি, তবুও বিশ্লেষকদের মতে ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই যুদ্ধবিমানের প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

কী এই জেএফ-১৭ থান্ডার?জেএফ-১৭ থান্ডার ওজনে বেশ হালকা। সবরকম আবহাওয়ায় যুদ্ধ করতে সক্ষম এই ফাইটার জেট। এটি যৌথভাবে তৈরি করেছে পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) এবং চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দুই দেশ এই প্রকল্পে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে পাকিস্তানের কামরায় উৎপাদন শুরু হয়।এই বিমানের উৎপাদনের প্রায় ৫৮ শতাংশ পাকিস্তানে এবং বাকি অংশ চীনে সম্পন্ন হয়। বিমানের ইঞ্জিন রাশিয়ান প্রযুক্তির, আর ইজেকশন সিট সরবরাহ করে বৃটিশ প্রতিষ্ঠান মার্টিন বেকার। তবে সম্পূর্ণ বিমানটি চূড়ান্তভাবে সংযোজন করা হয় পাকিস্তানেই।

২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে জেএফ-১৭ উন্মোচন করা হয়। ২০০৯ সালে এর প্রথম সংস্করণ ‘ব্লক-১’ পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে সবচেয়ে আধুনিক ‘ব্লক-৩’ সংস্করণটি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা প্রযুক্তিগতভাবে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত।এই সংস্করণে রয়েছে আধুনিক অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিকালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার, উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা এবং আকাশ ও স্থল- দু’ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা। এতে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মতো পূর্ণ স্টেলথ প্রযুক্তি নেই।

ইতিমধ্যে কোন কোন দেশ জেএফ-১৭ কিনেছে?মিয়ানমার প্রথম দেশ হিসেবে ২০১৫ সালে জেএফ-১৭ কেনে। তারা অন্তত ১৬টি বিমান অর্ডার দেয়, যার মধ্যে সাতটি ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। ২০২১ সালে নাইজেরিয়া তিনটি জেএফ-১৭ নিজেদের বিমান বাহিনীতে যুক্ত করে।এরপর ২০২৪ সালে আজারবাইজান ১৬টি জেএফ-১৭ কেনার চুক্তি করে, যার মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দেশটির বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে এই যুদ্ধবিমান প্রদর্শিত হয়।বাংলাদেশ, সৌদি আরব, ইরাক ও শ্রীলঙ্কাসহ আরও কয়েকটি দেশ গত এক দশকে এই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছায়নি।

জেএফ-১৭ এর প্রতি কেন এত আগ্রহ?বিশ্লেষকদের মতে, জেএফ-১৭-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এর তুলনামূলক কম দাম। প্রতিটি বিমানের মূল্য আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ডলার। যেখানে ফ্রান্সের রাফাল যুদ্ধবিমানের দাম ৯ কোটি ডলারের বেশি, সেখানে জেএফ-১৭ অনেক দেশের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প।এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চারদিনের তীব্র সংঘর্ষে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর সক্ষমতা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আনে। পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারত প্রথমে তা অস্বীকার করলেও পরে কিছু ক্ষতির কথা স্বীকার করে।যদিও ওই সংঘর্ষে জেএফ-১৭ সরাসরি ভূপাতিত করার ঘটনায় ব্যবহৃত হয়নি বলে ধারণা। তবে এটি পাকিস্তানি বিমান বহরের অংশ ছিল। এতে জেএফ-১৭-এর ‘কমব্যাট-প্রুভেন’ ভাবমূর্তি আরও জোরদার হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাৎপর্য কী?বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। জেএফ-১৭ বা সুপার মুশশাক কেনা শুধু একটি সামরিক চুক্তি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের ইঙ্গিত।

কারণ একটি যুদ্ধবিমান সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর ব্যবহৃত হয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। ফলে বাংলাদেশ যদি জেএফ-১৭ বহরে যুক্ত করে, তবে তা পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সহযোগিতার পথ খুলে দেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বিকল্প অংশীদার খুঁজছে অনেক উন্নয়নশীল দেশ। সেই বাস্তবতায়, পাকিস্তান নিজেকে একটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও কম রাজনৈতিক শর্তযুক্ত অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। আর জেএফ-১৭ সেই কৌশলেরই কেন্দ্রবিন্দু।(মূল ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত)

বাংলাদেশ সময়: ৫:৩৮:২৯   ৩৯ বার পঠিত  




আন্তর্জাতিক’র আরও খবর


‘জখম বা হাড় না ভাঙা’ পর্যন্ত স্ত্রীকে প্রহার বৈধ করেছে তালেবান
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও অনিশ্চয়তা রমজানের আনন্দ খুঁজে ফিরছে গাজাবাসী
পবিত্র আল-আকসার ইমামকে গ্রেপ্তার করল ইসরাইলের পুলিশ
বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার যুক্তরাজ্যের
শান্তিপূর্ণ দেশ গড়তে পূর্ণ সমর্থন দেবে জাতিসংঘ
তারেক রহমানের বিজয়কে যেভাবে দেখছে ভারতীয় মিডিয়া
বিশ্বগণমাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যা বলা হলো
তারেক রহমানকে ঐতিহাসিক বিজয়ের শুভেচ্ছা, কাজ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র
ভারতের মিডিয়ায় বাংলাদেশের নির্বাচনের লাইভ সম্প্রচার চলছে
বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের কড়া নিন্দা চীনের

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ