
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানিমিশ্রিত পোড়া ফার্নেস অয়েলের স্লাজ খাল হয়ে সাঙ্গু নদে মেশার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
অভিযোগের পর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দূষিত এলাকা পরিদর্শন করে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
জানতে চাইলে অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান টিবিএসকে বলেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দূষিত এলাকা পরিদর্শন করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নমুনার প্রতিবেদন আঞ্চলিক কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি বলেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাইরে যাওয়া দূষিত পানির পথ বন্ধ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তারা সেটি বন্ধ করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নোটিশও দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে মামলা হয়েছে কি না জানতে চাইলে মোজাহিদুর রহমান বলেন, “বিষয়টি এনফোর্সমেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা পরিবেশ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে নেওয়া হবে।”
খালে কালো তৈলাক্ত স্লাজ
সম্প্রতি সাতকানিয়ার কালিয়াইশ ইউনিয়নের মইল্ল্যা খালে সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি অংশে খালের পানি কালচে হয়ে গেছে। খালের পানি ও পাড়ের গাছপালায় কালো, তৈলাক্ত স্লাজের আস্তরণ দেখা যায়। পানি থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধও।
স্থানীয়রা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে জমে থাকা পানিমিশ্রিত পোড়া ফার্নেস অয়েলের স্লাজ বৃষ্টি ও বন্যার সময় ড্রেন দিয়ে খালে গিয়ে মিশছে। পরে মইল্ল্যা খাল দিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মলেয়াবাদ গ্রামের চাগাচর এলাকায় গিয়ে তা সাঙ্গু নদে পড়েছে।
মইল্ল্যা খালের উৎপত্তি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৩০০ মিটার পূর্বে উত্তর কালিয়াইশের মইল্যার ডেবা এলাকায়। খালটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষিণ পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে সাঙ্গু নদে মিশেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় খালের দুই পাশে প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে শতাধিক কৃষক চাষাবাদ করতেন। সেচের কাজেও খালের পানি ব্যবহার করা হতো। তবে দূষণের কারণে বর্তমানে ওই পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
তাদের দাবি, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পর থেকেই খালের পানিতে কালো স্লাজ মেশার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এতে পানির রং পরিবর্তনের পাশাপাশি মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর সংখ্যাও কমেছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বন্যার সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খালে জমে থাকা স্লাজ আশপাশের কৃষি জমি ও লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এর প্রতিবাদে গত ১২ সেপ্টেম্বর মানববন্ধনও করেন তারা। পরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
বর্জ্য অপসারণ শুরু
অভিযোগের পর খালে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ শুরু করেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, এক্সকাভেটর ও শ্রমিকদের মাধ্যমে খালের বিভিন্ন অংশ থেকে তেলযুক্ত বর্জ্য তুলে পাড়ে রাখা হচ্ছে। পরে ড্রামে করে সেগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ লিটার পানিমিশ্রিত পরিত্যক্ত ফার্নেস অয়েল স্লাজ সংরক্ষিত রয়েছে। এসব বর্জ্য নিলামের মাধ্যমে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অয়েলি ওয়েস্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে পানি খালে যাওয়ার পথও বন্ধ করা হয়েছে।
দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মো. আবদুল মান্নান টিবিএসকে বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যার পানির কারণে সংরক্ষণস্থলে থাকা কিছু পানিমিশ্রিত ফার্নেস অয়েল স্লাজ ড্রেন দিয়ে খালে চলে গিয়েছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর খাল থেকে বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ লিটার স্লাজ সংরক্ষণে রয়েছে। এগুলো নিলামের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে নিলাম শেষ করে সর্বোচ্চ দরদাতার মাধ্যমে বর্জ্যগুলো সরিয়ে নেওয়ার আশা করা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে অতিবৃষ্টি বা বন্যার সময় স্লাজ পানিতে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
‘প্রয়োজন স্থায়ী ব্যবস্থা’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, খাল থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য অপসারণ ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে ভবিষ্যতে অপরিশোধিত বর্জ্য যাতে খাল, নদী বা কৃষিজমিতে না পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
কালিয়াইশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল গফুর বলেন, শুধু খাল পরিষ্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য কীভাবে খালে পৌঁছাচ্ছে, তা শনাক্ত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইসমাইল বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কারণে স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। বর্জ্য অপসারণ শুরু হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তবে স্থায়ীভাবে দূষণ বন্ধ করা প্রয়োজন।
জলজ জীববৈচিত্র্যে ঝুঁকি
নদী গবেষক ও বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, “ফার্নেস অয়েল পানির সঙ্গে মিশে না; বরং পানির ওপর পাতলা একটি স্তর তৈরি করে ভেসে থাকে। এতে বাতাস থেকে পানিতে অক্সিজেনের মিশ্রণ এবং সূর্যের আলো পানির ভেতরে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে প্ল্যাঙ্কটন ও জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং এর প্রভাব মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপরও পড়ে।”
তিনি বলেন, “তেলের আস্তরণ মাছ, ব্যাঙ, সাপসহ জলজ প্রাণীর শরীরেও জমতে পারে। একইভাবে জলচর পাখির পালকে তেল লেগে তাদের স্বাভাবিক চলাচল ও জীবনধারণ ব্যাহত হতে পারে। এতে ধাপে ধাপে প্ল্যাঙ্কটন, জলজ উদ্ভিদ, মাছ ও অন্যান্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।”
মনজুরুল কিবরীয়া আরও বলেন, “তেলযুক্ত পানি নদীর চর বা আশপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়লে মাটির ওপরও তেলের আস্তরণ তৈরি হতে পারে। এতে মাটির গুণাগুণ ও উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উদ্ভিদ, ঘাস ও ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।”
ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, “উৎপাদন শুরুর আগেই তেলজাতীয় বর্জ্য সংগ্রহ, পরিশোধন ও নিরাপদে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বর্জ্য জমিয়ে রেখে বৃষ্টির পানি দিয়ে তা খাল বা নদীতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
তিনি বলেন, “ফার্নেস অয়েলের পরিবেশগত ক্ষতি বিবেচনায় এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পর্যায়ক্রমে ডিজেলচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা গেলে পানি, মাটি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।”
মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, “বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য নিষ্পত্তি ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।”
বাংলাদেশ সময়: ২৩:২৯:২৩ ৮ বার পঠিত #আইন #তেল #নদে #নিচ্ছে #পোড়া #বিদ্যুৎকেন্দ্রের #ব্যবস্থা #সাঙ্গু