![]()
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)-এর সাবেক কর্মকর্তা মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরী রিমান্ডে থাকা অবস্থায় চুল কাটা ও দাড়ি কামানোর অনুমতি না পাওয়ায় বিষয়টি আদালতের নজরে এনেছেন তার আইনজীবী।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মৌলিক চাহিদা পূরণে ‘সমস্যা কোথায়’? তিনি মন্তব্য করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-কেও একসময় ‘এ ধরনের কষ্ট’ সহ্য করতে হয়েছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ১৮ মাস কারাগারে থাকার সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে তার ওপর ‘নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতন’ চালানো হয়েছিল, যেখানে ডিজিএফআইয়ের কিছু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে আসে।
গত ৯ এপ্রিল মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাঞ্জিল হায়দারকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জুলাই আন্দোলনের সময় ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াদুদ নিহতের ঘটনায় নিউ মার্কেট থানায় দায়ের করা মামলায় তাকে তিন দফায় মোট ১২ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এরপর ২২ এপ্রিল রমনা মডেল থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে পাঁচ দিনের এবং ২৬ এপ্রিল আরও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
দুই দফায় ৯ দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে নতুন করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, রমনা জোনাল টিমের পরিদর্শক মো. আমজাদ হোসেন তালুকদার।
আবেদনে বলা হয়, ‘আসামি ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তীতে সরকারবিরোধী কার্যক্রমকে গতিশীল করা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অস্থিতিশীল করা এবং অপপ্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।’
আরও বলা হয়, তিনি সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত এবং তার নির্দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলো সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে মিছিল করেছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, এসব সংগঠনকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, অর্থ ও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পলাতক আসামিদের বিষয়ে তিনি আংশিক তথ্য দিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা যুক্তি দেন, পলাতক আসামিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানার জন্য তাকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
আসামিপক্ষে আইনজীবী কামাল হোসেন রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করেন। তিনি বলেন, ‘২১ বছর তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন, এর মধ্যে ১৭ বছর মেজর পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ডিজিএফআইয়ের প্রশাসনিক ও উইং পর্যায়ে কাজ করেছেন। অসৎ কর্মকর্তা হলে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বছরের ১৫ নভেম্বর তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, অথচ মামলার ঘটনাটি ১২ সেপ্টেম্বরের। তখন তিনি কর্মরত ছিলেন। এ ধরনের অভিযোগ তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি পরিস্থিতির শিকার।’
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘আসামি তারিক সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠ সহচর। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারিক সিদ্দিকির গাড়িচালক ও কেয়ারটেকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল ঘটনার সহায়তাকারী হিসেবে তার নাম এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক-এগারোর কুশীলবদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ড. ইউনূস সরকারের সময়সহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড এবং ইলিয়াস আলী গুমের সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।’
তার ভাষ্য, ‘হাসিনা হঠাৎ করে ফ্যাসিস্ট হননি; তাকে এমন অবস্থায় নিতে এরা ভূমিকা রেখেছে। তাই সর্বোচ্চ রিমান্ড প্রয়োজন।’
এ সময় বিচারক প্রশ্ন তোলেন, ‘আসামি যদি তারিক সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠ হন, তাহলে ১৭ বছর মেজর পদেই কেন ছিলেন? তার তো পদোন্নতি হওয়ার কথা ছিল।’
জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, ‘এটা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। তাকে দিয়ে সুবিধা নেওয়া হয়েছে।’
পরে আইনজীবী কামাল হোসেন আবারও মাঞ্জিল হায়দারের চুল কাটা ও দাড়ি কামানোর বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত ২৬ এপ্রিল এ বিষয়ে আবেদন করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন কোনো নিয়ম নেই।’
তখন বিচারক মন্তব্য করেন, ‘চুল কাটা, শেভ করার মতো বিষয়েও কি আদালতের নির্দেশ লাগবে? এগুলো তো মৌলিক বিষয়। খাওয়া-দাওয়া বা টয়লেটে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কি নির্দেশ দিতে হবে?’
জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
বিচারক তখন বলেন, ‘মামলা চলছে, রিমান্ড হচ্ছে—এটা করতে সমস্যা কোথায়? আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও তো এমন কষ্ট দেওয়া হয়েছিল।’
শুনানি শেষে আদালত মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা গত ১২ সেপ্টেম্বর রূপায়ন টাওয়ারের সামনে মিছিল করেন। তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে সংগঠনের কার্যক্রমকে সক্রিয় করা, রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা পালানোর চেষ্টা করলে কয়েকজনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়।
এ ঘটনায় রমনা মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন উপপরিদর্শক (এসআই) আওলাদ হোসেন।
বাংলাদেশ সময়: ২২:৪৯:০০ ৮ বার পঠিত