
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। সামরিক কর্মকর্তা ও মার্কিন প্রশাসনের সূত্রগুলো বলছে, এর ফলে অনেক সৈন্য ঘাঁটি থেকে সরে গিয়ে বিভিন্ন হোটেল এবং অফিস স্পেস থেকে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমানে স্থলভিত্তিক সামরিক বাহিনীর একটি বড় অংশ ‘রিমোটলি’ বা দূরবর্তী স্থান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। তবে যুদ্ধবিমান চালানো, রক্ষণাবেক্ষণ এবং হামলা পরিচালনায় নিয়োজিত পাইলট ও ক্রুরা এই বিকল্প উপায়ের বাইরে।
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব মার্কিন সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে ইরানের আইআরজিসি। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই হুমকি ইরানবিরোধী যুদ্ধ পরিচালনায় পেন্টাগনকে দমাতে পারবে না।
কিন্তু এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ইরানের হামলার মুখে সেনাদের বিকল্প স্থানে সরিয়ে নেওয়াটা ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছে। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর সময় এই অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন ছিল। সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) তাদের মধ্য থেকে কয়েক হাজার সেনাকে বিভিন্ন জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে। কয়েকজনকে ইউরোপের মতো দূরবর্তী স্থানেও পাঠানো হয়েছে। তবে অনেক সেনাই মধ্যপ্রাচ্যে থেকে গেছেন। তারা এখন মূল ঘাঁটিতে নেই। ফলে যুদ্ধ পরিচালনা করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর বিশেষ অভিযান বিশেষজ্ঞ ছিলেন ওয়েস জে ব্রায়ান্ট। তিনি বলছেন, আপনি চাইলেই অভিযান চালানোর সরঞ্জাম একটি হোটেলের ছাদে বসিয়ে দিতে পারেন না। কিছু সরঞ্জাম অত্যন্ত ভারী ও স্থানান্তর করা বেশ জটিল কাজ।
ঘাঁটি এখন বিপর্যস্তমধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি দূতাবাস এবং তেল ও গ্যাসের অবকাঠামোতেও হামলা করেছে ইরান। এই অঞ্চলে ১৩টি সামরিক ঘাঁটির বেশিরভাগই এখন বসবাসের অনুপোযোগী। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কুয়েতের ঘাঁটিগুলোতে। সেখানে ছয়জন সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আলী আল সালেম ঘাঁটিতে উড়োজাহাজের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত ও কিছু কর্মী আহত হয়েছেন। ক্যাম্প বুহরিংয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি সুবিধাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতারে আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিটি সেন্টকমের আঞ্চলিক সদরদপ্তর (বিমান)। সেখানে আগাম সতর্কতার একটি রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইনে ইরানি ড্রোন মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরের যোগাযোগ সরঞ্জামগুলোতে আঘাত হানে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বেশ কয়েকটি জ্বালানি ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত সপ্তাহে পেন্টাগনের এক সংবাদ সম্মেলনে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেন, ব্যাপক বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরানিদের এখনো সক্ষমতা অবশিষ্ট আছে। পুরো অঞ্চলজুড়ে থাকা কয়েক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সৈন্য ও স্বার্থ রক্ষা করতে সাহায্য করছে।
হিসাব-নিকাশ ভুল ছিলকিছু সামরিক কর্মকর্তার মতে, ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে প্রশাসনের হিসাব-নিকাশ ভুল ছিল। সামরিক অভিযানের বিষয়ে অবগত দুজন সাবেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির কমান্ড সেন্টারগুলোর ছাদে কোনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা স্তর ছিল না। ফলে সেখানে ইরানের হামলায় একজন সেনাসদস্য নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হন।
সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, মার্কিন রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কারগুলোকে (জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান) পূর্ব প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় না দিয়ে সরাসরি চব্বিশ ঘণ্টার অভিযানে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলাফল দুটি কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কারের সংঘর্ষে ছয়জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
ওয়েস জে ব্রায়ান্ট বলছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর বড় দক্ষতা হলো তারা দূরবর্তী স্থানে থেকেও কাজ চালিয়ে যেতে পারে। শেষ সারির একজন সাধারণ সৈনিকও অভিযান অব্যাহত রাখতে জানে। কিন্তু তারপরও কিছু না কিছু ক্ষতি তো হয়েই যায়।
বাংলাদেশ সময়: ১৯:২২:৪২ ১০ বার পঠিত