
করপোরেট মুনাফা কমে যাওয়া, ভোক্তাদের ব্যয়ে স্থবিরতা ও তীব্র মূল্যযুদ্ধের কারণে চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। গত মে মাসের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দেশটির শেয়ারবাজারের বাজারমূল্য ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার কমেছে। বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়ায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক এই পতন বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রধান শেয়ার সূচক সিএসআই ৩০০ বিয়ার মার্কেটে প্রবেশ করেছে এবং হংকংয়ের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারেও চাপ বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তাদের ব্যয় কম থাকা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কম দামে পণ্য বিক্রির প্রতিযোগিতা কোম্পানিগুলোর মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংক, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও এ চাপের বাইরে নয়। অর্থনীতিকে চাঙা করতে সরকার বড় ধরনের নতুন প্রণোদনা দেবে—এমন প্রত্যাশা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। জার্মানির বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বেরেনবার্গের বহুমুখী সম্পদ বিনিয়োগ কৌশল ও গবেষণা বিভাগের প্রধান উলরিখ উরবান জানান, সবচেয়ে খারাপ সময় পেরিয়ে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। তার মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো করপোরেট মুনাফা। উৎপাদন ও রপ্তানিতে চীনের শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও তা অভ্যন্তরীণ চাহিদা, পণ্যের দাম নির্ধারণের সক্ষমতা এবং কোম্পানিগুলোর মুনাফায় ধারাবাহিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। চীনা কোম্পানিগুলোর তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের শুরুটাও হতাশাজনক। ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড (সিএটিএল) মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ থেকে এমএসসিআই চায়না সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর ২০২৬ সালের মুনাফার পূর্বাভাস ৪ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে ই-কমার্স খাতের মূল্যযুদ্ধের কারণে হংকংয়ের হ্যাং সেং টেক সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফার পূর্বাভাস ১৩ শতাংশের বেশি কমেছে। ব্যয় বৃদ্ধি ও তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে চায়না মোবাইলের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ কমেছে। মুনাফা কমে যাওয়ায় চীনের বড় ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোর নগদ অর্থের ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করছে, যার মধ্যে আলিবাবা গ্রুপ হোল্ডিংয়ের ১০ বিলিয়ন ডলারের নতুন শেয়ার বিক্রির উদ্যোগও রয়েছে। সুমিতোমো মিতসুই ডিএস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক স্ট্যানলি ট্যাং জানান, চীনের তুলনায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের কোম্পানিগুলোর আয়ের পরিস্থিতি ভালো। চীনের অভ্যন্তরীণ শেয়ারবাজারে লেনদেন গত বছরের জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমেছে। দরপতন ঠেকাতে চীনা কর্তৃপক্ষ ‘জাতীয় দল’ নামে পরিচিত রাষ্ট্রীয় তহবিল সক্রিয় করেছে। তবে কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে চীনা শেয়ারের মূল্যায়ন এখন তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসের চীনা শাখা জানিয়েছে, তারা দেশটির শেয়ারবাজার নিয়ে সতর্কভাবে আশাবাদী। চীনের জিডিপি চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে করপোরেট মুনাফা ও ভোক্তা চাহিদার উন্নতি না হলে শেয়ারবাজারের ওপর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশ সময়: ২১:০৪:৩৫ ৮ বার পঠিত #অর্থনীতি #করপোরেট মুনাফা #চীন #বিনিয়োগ #শেয়ারবাজার