২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৭২ ডেথ রেফারেন্স বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ফাঁসির আসামিরা

প্রথম পাতা » জাতীয় » ২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৭২ ডেথ রেফারেন্স বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ফাঁসির আসামিরা
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬



বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ফাঁসির আসামিরা

বরগুনা সরকারি কলেজে ২০১৯ সালের ২৬ জুন দিনদুপুরে রিফাত শরীফ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে একদল দুর্বৃত্ত। রিফাত হত্যা মামলায় ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রায়ে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও জরিমানা করা হয়। রায়ের পর আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) জন্য বিচারিক আদালতের রায়সহ নথিপত্র ২০২০ সালের ৪ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। রায়ের বিরুদ্ধে মিন্নিসহ ছয় আসামি ওই বছরই পৃথক আপিল করেন। কিন্তু আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি এখনো হয়নি। হাইকোর্টে মামলাটি সাড়ে ৫ বছর ধরে ঝুলে আছে। শুধু এ মামলাই নয়-এমন শত শত মামলা উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় আছে।

আইনি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় মিন্নিসহ ছয় আসামি কনডেম সেলে কাটিয়ে দিয়েছেন প্রায় ছয় বছর। তার মতো আড়াই হাজারের বেশি ফাঁসির আসামি কনডেম সেলে আছেন বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। পর্যায়ক্রমে তাদের মামলা একদিন কার্যতালিকায় উঠবে। সে অপেক্ষায় তাদের প্রতিমুহূর্ত কাটে মৃত্যুযন্ত্রণায়। তাদের পরিবার ও স্বজনরা থাকেন উৎকণ্ঠায়। আইনি প্রক্রিয়ার ফেরে পড়ে বছরের পর বছর শত শত আসামিকে থাকতে হচ্ছে কনডেম সেলে।

বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হিসাবে পরিচিত। নিয়ম অনুসারে মৃত্যুদণ্ডের আসামিদের ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্য বিচারিক আদালতের রায় ও নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। আর সাজার রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তিরা কারাগারে থেকে জেল আপিল করতে পারেন। দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিল ও বিবিধ আবেদন করতে পারেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টে এখন ১ হাজার ২৭২টি ডেথ রেফারেন্স বিচারাধীন, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ডেথ রেফারেন্সের বিপরীতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়মিত জেল আপিলও রয়েছে। ডেথ রেফারেন্সের নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টে এখন মাত্র চারটি বেঞ্চ। যেগুলোয় ২০১৮-২০১৯ সালের ক্রম অনুযায়ী মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি হচ্ছে। নিয়মিত ডেথ রেফারেন্স মামলা পরিচালনা করেন এমন আইনজীবীরা বলেন, হাইকোর্টে বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড বা ডেথ রেফারেন্সের নিষ্পত্তিতে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগে।

জানা যায়, ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা, মাগুরায় আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ বেশকিছু চাঞ্চল্যকর মামলার ডেথ রেফারেন্স রয়েছে শুনানির অপেক্ষায়। এসব মামলায় প্রায় আড়াই হাজার ফাঁসির আসামি কনডেম সেলে আছেন।

এ অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের আইনজ্ঞরা। তারা বলেছেন, প্রাণদণ্ডের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিচারিক আদালতে কোনো নীতিমালা নেই, যদিও সেটি আদালতের এখতিয়ার। ফলে ফাঁসির আসামি বাড়ছে। অন্যদিকে উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির গতি না বাড়ায় অনিষ্পন্ন মামলা বাড়ছে। ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত পেপারবুক তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। লম্বা মুলতুবি ছাড়া শুনানি অব্যাহত রাখতে হবে। এছাড়া বিশেষ বেঞ্চ বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ বিচারপতির সংখ্যা বড়ানো প্রয়োজন।

ডেথ রেফারেন্স শাখার এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স যে হারে বাড়ছে, তাতে নিষ্পত্তির হার কম। বর্তমানে প্রায় ১৩শ ডেথ রেফারেন্স রয়েছে শুনানির জন্য। চারটি বেঞ্চে এ শুনানি চলছে।

মিন্নির আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না। তিনি সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট) ট্রাস্টি। জানতে চাইলে শনিবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, অনেক সময় নির্দোষ ব্যক্তির বিচারিক আদালতে সাজা হয়। মৃত্যুদণ্ডের আসামিরা বছরের পর বছর কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে। এজন্য ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিল শুনানি করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

পান্না বলেন, গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের মাধবীলতা সেলে মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে কনডেম সেলে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন মিন্নি। অসুস্থতাসহ বিভিন্ন গ্রাউন্ডে আমরা তার জামিন চেয়েছি। আদালত জামিন শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে জামিনের আবেদনটি বিভিন্ন বেঞ্চে গেলেও আর শুনানি হয়নি। আদালত ইচ্ছা করলে অসুস্থতা গ্রাউন্ডে জামিন দিতে পারেন।

জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাসুদ রানা শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, যে কোনো মামলা শুনানি হওয়া, সেটি আদালতের এখতিয়ার। প্রধান বিচারপতি ইতঃপূর্বে বেশকিছু মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি মনে করি, বর্তমানে যেসব ডেথ রেফারেন্স মামলা হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এসব মামলা শুনানি হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ উভয়ই শুনানির উদ্যোগ নিতে পারে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৪ সালে ডেথ রেফারেন্স মামলা ছিল ৪৩৯টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১০১টি। আর বিচারাধীন থাকে ৩৩৮টি। পরের বছর ২০০৫ সালে মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১৩। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৪৯টি, বিচারাধীন থাকে ৪৬৪টি। ২০০৬ সালে ৫৭৬টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৬৫টি। ২০০৭ সালে মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ৬১৩টি। নিষ্পত্তি হয় ১৪৮টি, বিচারাধীন থাকে ৪৬৫টি। ২০০৮ সালে ৬০২টি মামলা থেকে নিষ্পত্তি হয় ১২৮টি। ২০০৯ সালে ৫৫৭টি থেকে নিষ্পত্তি হয় ৪৮টি। এভাবে ক্রমান্বয়ে ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭৫টি এবং নিষ্পত্তি হয় ১০০টি। বিচারাধীন ছিল ৭৭৫টি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস দেখা দেওয়ার পর আদালত বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে বিচারাধীন ডেথ রেফারেন্সের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৯টি। ২০২৫ সালের জুনে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ২০৭টি। আর ওই বছরের ডিসেম্বরে ১ হাজার ২৭২টি ডেথ রেফারেন্স মামলা বিচারাধীন ছিল, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ সময়: ১৭:৩১:২৪   ২ বার পঠিত  




জাতীয়’র আরও খবর


দাম বাড়লো সয়াবিন তেলের
২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৭২ ডেথ রেফারেন্স বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ফাঁসির আসামিরা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু
ভ্রাম্যমাণ লিগ্যাল এইড ক্যাম্প চালু, বিনামূল্যে আইনজীবী সেবা পাবে সাধারণ মানুষ
দুই সচিবকে বদলি, একজনের পদোন্নতি
‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে অনুমতি ছাড়া ভিডিও প্রচার করলে দ্রুত বিচার
বিচার বিভাগে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা, জনভোগান্তি কমাতে সংস্কারে গতি আনছে সরকার
যে কারাগারে খালেদা জিয়ার শরীরে ধীরে ধীরে বিষ দেওয়া হয়
সোমবার থেকে সারাদেশে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু
আইনমন্ত্রী মামলা জট নিরসনে সরকারের বহুমাত্রিক পদক্ষেপ

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ