![]()
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্য পদত্যাগ করেছেন। এরপরই গণমাধ্যমে তাদের পক্ষ থেকে একটা খোলা চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে বিদায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর পাশাপাশি সদস্য নূর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের স্বাক্ষর রয়েছে। এর আগে, গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ পুনরায় চালু হলো।
চলতি বছরের ৫ই ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার একেবারে শেষ দিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কমিশনের চেয়ারপারসন হিসেবে নিয়োগ পান হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি এ নিয়োগ দেন। কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা গুম কমিশনের সদস্য মো. নূর খান, নাবিলা ইদ্রিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান।
এদিকে, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে খোলা চিঠি দিয়েছেন পাঁচজন কমিশনার। চিঠিতে সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব, অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তি চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন সদ্য বিদায়ী পাঁচজন মানবাধিকার কমিশনার। কমিশনের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এবং কমিশনার মো. নূর খান লিটন, ইলিরা দেওয়ান, অধ্যাপক মো. শরিফুল ইসলাম ও ড. নাবিলা ইদ্রিস এই চিঠি লিখেন।
খোলা চিঠিতে সাবেক এই মানবাধিকার কমিশনাররা লিখেন, আমরা পাঁচজন সদ্য বিদায়ী মানবাধিকার কমিশনার। স্ব স্ব ক্ষেত্রে আমাদের কর্মজীবন মানবাধিকার সুরক্ষায় নিবেদিত ছিল। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার দরুন ভুক্তভোগীদের বেদনা, আইন প্রয়োগকারীদের দৈনন্দিন প্রতিকূলতা এবং আইনাঙ্গনের জটিলতার সঙ্গে আমরা সুপরিচিত। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি। খোলা চিঠিতে রয়েছে তিনটি অংশ- সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব, অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তি চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা।
সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব: অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পক্ষে যুক্তি হিসেবে সংসদে বেশ কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে; এর সঠিক তথ্য দেয়া হলো। তবে শুরুতেই স্পষ্ট করা দরকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ হলো প্রিন্সিপাল আইন; এর ওপরই দাঁড়িয়ে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ এবং ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’। সুতরাং নিম্নোক্ত আলোচনা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত এই তিনটি অধ্যাদেশ নিয়েই। এক. সংসদে বলা হয়েছে, গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর, যা ভুক্তভোগীদের জন্য অবিচার। বাস্তবে: গুম অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রাভেদে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড এবং জরিমানা (ধারা ৪(১)-(২))। দুই. সংসদে বলা হয়েছে, অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা নেই এবং জরিমানা নির্ধারণ ও আদায়ের উপায় নেই। বাস্তবে: মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা স্পষ্ট বেঁধে দেয়া আছে (ধারা ১৬(১) (ঙ)-(চ)) এবং জরিমানা নির্ধারণ ও আদায়ের পদ্ধতি বিস্তারিত আছে (ধারা ২৩)। এমনকি সময়মতো তদন্ত রিপোর্ট দাখিল না করলে গুম অধ্যাদেশে শাস্তির বিধানও রয়েছে (ধারা ৮(৫))। বরং সংসদ কর্তৃক পুনর্বহালকৃত ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইনে এগুলো কিছুই নেই। তিন. সংসদে বলা হয়েছে, আইসিটি আইন যথেষ্ট। মানবাধিকার কমিশন এবং গুম অধ্যাদেশ ‘বালখিল্যতা’ মাত্র। গুম অধ্যাদেশ আইসিটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাস্তবে: আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার করতে পারে, সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয় (ধারা ৩(২) (এ))। কোনো অপরাধ মানবতাবিরোধী হিসেবে গণ্য হতে হলে তা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হতে হয়, অনেকটা হত্যা আর গণহত্যার পার্থক্যের মতো। তাই আইসিটি ‘বিচ্ছিন্ন’ গুমের বিচার করতে পারে না, শুধু ‘গণহারে’ গুমের বিচার করতে পারে। সংসদে বলা হচ্ছে, আইনে এ বিষয়ে ‘অ্যাম্বিগুইটি’ আছে, যা সঠিক নয়। গুম অধ্যাদেশও বলে যে, ব্যাপক বা পদ্ধতিগত গুমের বিচার আইসিটির এখতিয়ারভুক্ত (ধারা ২৮)। সংসদে বলা হয়েছে দুটো আইন ‘ম্যাচিং’ করার উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে। যেহেতু ‘বিচ্ছিন্ন গুম’ আর ‘গণহারে গুম’ ভিন্ন অপরাধ, তাই আইন ‘ম্যাচিং’ করার কোনো অবকাশ নেই। এদিকে, সংসদ কর্তৃক অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার কারণে ১১ই এপ্রিল থেকে কোনো নতুন গুম হলে সেটি ফৌজদারি আইনেও সংজ্ঞায়িত নয় এবং আইসিটিতে গেলেও ভুক্তভোগীরা কোনো প্রতিকার পাবেন না।
চার. সংসদে বলা হয়েছে, অধ্যাদেশ পাসের মাধ্যমে জুলাইযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে : জুলাই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধের কারণে মৃত্যু হলে জুলাইযোদ্ধারা সুরক্ষিত থাকবেন; তবে বিশৃঙ্খলার সুযোগে সংঘটিত হত্যা হলে মামলা হবে (ধারা-৫)। স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে কোনো মৃত্যু কোন শ্রেণিতে পড়বে তা মানবাধিকার কমিশন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। কিন্তু পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে মানবাধিকার কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না (ধারা-১৮)। তদন্ত করবে সেই সরকারি বাহিনীগুলোই, যারা জুলাইয়ে নিজেরাই সরাসরি পক্ষ ছিল। যে তরুণ রাস্তায় নেমেছিলেন, তার ভাগ্য নির্ধারণ করবেন তিনিই যার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে ভবিষ্যতে সব রাজনৈতিক দলের জুলাইযোদ্ধারাই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
পাঁচ. সংসদে বলা হয়েছে, কমিশন তদন্ত করে আবার নিজেই বাদী হয়ে মামলা করা পক্ষপাতমূলক। বাস্তবে: কোনো অভিযোগ আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে প্রতীয়মান হলে কমিশনের মামলা করার সুযোগ আছে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব কেবল তখনই হতো যদি কমিশন সেই মামলায় বিচারকের ভূমিকাও পালন করতো, যা অধ্যাদেশে নেই। তদন্তকারী পুলিশও নিয়মিত বাদী হয়ে মামলা করে, কেউ সেটাকে পক্ষপাতমূলক বলে না। ছয়. সংসদে বলা হয়েছে, ২০০৯ ও ২০২৫ উভয় আইনেই কমিশন স্বায়ত্তশাসিত, তাই দু’টিই সমান শক্তিশালী। বাস্তবে: পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত করতে পারে না (ধারা- ১৮), কিন্তু ২০২৫ অধ্যাদেশে পারতো। অতএব স্বায়ত্তশাসন মানেই কার্যকর ক্ষমতা থাকা নয়।
সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে সরকারের প্রকৃত আপত্তিগুলো নথিভুক্ত আছে। আপত্তিগুলোর মূলে একটাই নীতি, মানবাধিকার কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা খর্ব করা। প্রথমত, কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীন রাখার দাবি। এটি কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পরিপন্থি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশনকে জবাবদিহি করতে হতো রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, অডিটর জেনারেল এবং নাগরিক সমাজের কাছে। পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে কমিশন আবার কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরেছে। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির দাবি। বিগত ১৫ বছরে গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রায় সব অভিযোগই ছিল সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে। সরকারি প্রতিষ্ঠান অভিযুক্ত হলে সরকারেরই অনুমতিক্রমে তদন্ত অর্থহীন। পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে কমিশনের এই স্বাধীন তদন্তক্ষমতা আর নেই (ধারা-১৮)। তৃতীয়ত, সরকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে ইচ্ছুক। কিন্তু সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩(২) মোতাবেক গুমের সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছিল; যে কারণেই আটক হোক, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করলেই সেটা গুম নয়। আইনে সংবিধানের বাধ্যবাধকতা এড়ানো অসম্ভব। চতুর্থত, বাছাই কমিটিতে আরও সরকারি প্রতিনিধিত্বের দাবি। ২০২৫ অধ্যাদেশে বাছাই কমিটির ৫০ শতাংশ নির্বাহী-ঘনিষ্ঠ ছিল। পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্তকরণসহ বাছাই কমিটির ৬০ শতাংশ নির্বাহী-ঘনিষ্ঠ। এতে করে কমিশনার নিয়োগে পূর্বের ন্যায় দলীয়করণের সুযোগ ফিরলো।
ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা:
বাংলাদেশ সময়: ৪:২০:১৪ ২৭ বার পঠিত