
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ‘পীর’ শামীম রেজা (এনআইডি নাম- আব্দুর রহমান) হত্যার ঘটনায় তিনদিন পার হলেও থানায় মামলা দায়ের করা হয়নি আজও। এমনকি হত্যাকারীরা শনাক্ত হলেও পুলিশ তাদের কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এমনকি অভিযানও চালায়নি। এদিকে, প্রকাশ না করলেও নিরাপত্তা শঙ্কায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এ নিয়ে দোলাচলে পড়েছে পীর হত্যা মামলা।
পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ফিলিপনগর এলাকার যুবক রাজিব, রিঙ্কু, আসানুল মিস্ত্রি, রিফাত ও রাসেলের নেতৃত্বে বিভিন্ন বয়সী শতাধিক উচ্ছৃঙ্খল জনতা পীর শামীমের বিরুদ্ধে সেøাগান দিয়ে তার আস্তানায় হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারী যুবকরা পীর শামীমকে তার কক্ষ থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে দোতলা থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে। এরপর তারা সংঘবদ্ধভাবে আস্তানায় আগুন জ¦ালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এদিকে, পীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভক্তরা দাবি করেছেন, তাদের বাবাকে হত্যা করা ছিল হামলাকারীদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে ৫ থেকে ৭ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র গোপনে এ পরিকল্পনা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল- পরিকল্পিতভাবে পীরকে হত্যা করে দরবারে লুটপাট চালানো।
ভক্তদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের দিন (শুক্রবার) রাতে ফিলিপনগর এলাকার গাজী মিস্ত্রির ছেলে রাজিবের (৩২) নেতৃত্বে একই এলাকার আহসানুল মিস্ত্রি (৪০), জোয়াদ সরদারের ছেলে রিঙ্কু (২৮), ইসমাইল প্রামানিকের ছেলে রাছেল (৩২) এবং হিরন সরদারের ছেলে রিফাত (১৮) একটি মেসেঞ্জার গ্রুপ খুলে হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, পূর্বের একটি ভিডিও কাটছাঁট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুকে) ছড়িয়ে দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও এলাকাবাসীকে উসকে দেয়া। পরদিন (শনিবার) বাদ আসর দরবারে হামলার ঘোষণা দিয়ে বেলা ১১টার দিকে ফিলিপনগর আবেদের ঘাট এলাকায় স্থানীয় লোকজনকে জড়ো করে। এ সময় পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে পীর শামীমের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তাদের। পরিকল্পনার বিষয়টি পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ টের পেলে অভিযুক্তরা সময় পরিবর্তন করে বাদ জোহর হামলার পরিকল্পনা করে দরবার বা পীরের আস্তানায় হামলা চালায়। তবে হামলায় নেতৃত্ব দেয়া যুবকরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আস্তানার পেছন দিয়ে প্রবেশ করে পীর শামীমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে।
এর আগে ২০২১ সাল থেকেই একই চক্র পীর শামীমকে হত্যার পরিকল্পনা করে তা ব্যর্থ হয়। তবে সে সময় তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ এনে দৌলতপুর থানায় মামলা করলে শামীমকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করে পুলিশ। ছয় মাস কারাভোগের পর সে আস্তানায় ফিরে একই কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পার হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা দায়ের না হওয়ায় এবং কেউ আটক বা গ্রেপ্তার না হওয়ায় জনমনে এক ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিহত শামীমের বড় ভাই, অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফজলুর রহমান সান্টু বলেন, পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা মামলা করবো না। যাকে হারিয়েছি, তাকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। অযথা ঝামেলায় জড়াতে চাই না আমরা। তিনি আরও বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ। আমার বয়স ৭০ বছরের বেশি। মামলা করতে গেলে যে দৌড়ঝাঁপ ও তদবির করতে হবে, তা আমার পক্ষে সম্ভব না। তা ছাড়া, আমাদের পরিবারের সবাই বাইরে থাকে। আমি একা বাড়িতে থাকি। এ নিয়ে নতুন করে ঝামেলা হোক- এটা পরিবারের সদস্যরা চাচ্ছে না। তবে এ নিয়ে কোনো ধরনের চাপ বা হুমকি আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, বর্তমানে দরবার এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পীর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান জানান, নিহতের পরিবার মামলা করতে না এলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করবে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হবে।
বাংলাদেশ সময়: ৪:১৯:৪৭ ২৮ বার পঠিত