
বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের পূর্বাচলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৯৯ কোটি টাকার রসিদ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া তাঁর স্ত্রী নুসরাত জাহানের নামে পাওয়া যায় চার কোটি টাকার সোনালী ব্যাংকের একটি চেক এবং এক ভরি ওজনের হোয়াইট গোল্ড (সাদা স্বর্ণ)।
গত ২০ জুলাই ঢাকার পূর্বাচলে জিয়ার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ওইসব সম্পদ উদ্ধার করে জব্দ করেছে দুদক। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ২০ সদস্যের টিমের ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিযানে উপস্থিত থাকা একটি সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। অভিযান চলাকালে খুঁজতে খুঁজতে জিয়ার স্ত্রী নুসরাজ জাহানের নামে চার কোটি টাকার একটি চেক পাওয়া যায়। কোন ক্ষেত্রে ঘুষের টাকা বাবদ চেকটি পেয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় চেকটি নিজের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার সুযোগ পাননি তিনি।
এছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এ আই ইন্টারন্যাশনালের নামে ৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকার রসিদ পাওয়াকে বিস্ময়কর বলে উল্লেখ করেছেন ওই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার বাসভবনে প্রায় একশ কোটি টাকার ‘মানি রিসিট’ থাকার কথা নয়। অভিযানের সময় এ আই ইন্টারন্যাশনাল সংক্রান্ত দলিল ও যাবতীয় কাগজপত্র জব্দ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, নজরদারি সংক্রান্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোনের ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। এটি কোথা থেকে আনা হয়েছে, কেন আনা হয়েছে- তদন্তে এসব তথ্য বের করা হবে।
ওইদিন অভিযান চালিয়ে আরও সাড়ে চারশ রকমের মূল্যবান পণ্য সামগ্রী পাওয়া যায়। এর মধ্যে পোশাক, শাড়ি, গহনা, দামি আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীসহ অন্যান্য জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়।
অত্যাধুনিক ডিজিটাল ভল্ট
পূর্বাচলের জলসিঁড়ি প্রকল্পের জয়িতা নামের ভবনের ৮ ও ৯ তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল ভল্ট পাওয়া গেছে। অনেক খোঁজ করে ওই ভল্টের চাবিও মিলে। ওই চাবি দিয়ে ভল্ট খুলে ভেতরে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।

অভিযানের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানায়, বিশেষায়িত এ ধরনের ভল্ট সচরাচর দেখা যায় না। বাসা-বাড়িতে তো থাকার প্রশ্নই আসে না। একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হয়ে কেন এই ধরনের ভল্ট সংগ্রহ করা হয়েছে- এ নিয়ে জিয়াউল আসানের কাছে জানতে চাওয়া হবে।
অত্যাধুনিক সুইমিং পুল
পূর্বাচলের জলসিঁড়ি আবাসিক প্রকল্পের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫০৬ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর প্লটে নয় তলা বাড়ির ৮ ও ৯ তলা ডুপ্লেক্স করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করতেন জিয়াউল আহসান। ভবনের ছাদে নিজেদের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে অত্যাধুনিক সুইমিং পুল। দৃষ্টিনন্দন এই সুইমিং পুলটি নির্মাণে মোটা অংকের টাকা খরচ করা হয়েছে।

ভবনটির ২ তলা থেকে ৭ তলা পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ভাড়া দেওয়া আছে। আদালতের এক আদেশে ওই ভবনটির রিসিভার হিসেবে জেলা প্রশাসককে নিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর তত্বাবধানে এইসব ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ব্যাংকের নির্দিষ্ট হিসাবে জমা রাখা হবে।
জিয়া ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা
অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ব্যাংকে অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগে জিয়াউল আহসান ও তাঁর স্ত্রী নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৩ জানুয়ারি মামলা করে দুদক। এই মামলাটির তদন্ত করছেন দুদক উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম। তদন্ত পর্যায়ে পূর্বাচলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ওইসব মালামাল উদ্ধার করা হয়।
এর আগে তাদের ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৩৪২ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে। জিয়া ও তাঁর স্ত্রীর নামে পাওয়া যায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভুত সম্পদ। বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়া বর্তমানে কারাগারে এবং তাঁর স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ৫:১৫:৪৩ ৪ বার পঠিত