
কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পেশকার রবিউল্লাহ ও অফিস সহায়ক ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে আইনজীবীসহ বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।
এ ঘটনায় আদালতসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আদালতের মতো স্থানে আইনজীবীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নেটিজেনরাও।
এদিকে টাকা নেওয়ার ঘটনার বিষয়টি নজরে আসায় তাদের শোকজ করার পর জবাব দাখিল করা হলেও রবিবার (১২ এপ্রিল) বিকেল পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, ভিডিও’র শুরুতে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অফিস সহায়ক ফারুক হোসেন নীল কাগজের মামলার নথি নিয়ে আদালতের কক্ষেই দাড়িয়ে আছেন। এ সময় জনৈক আইনজীবী তাঁর মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে ফারুকের হাতে দেন। এরপর ফারুক হোসেন ওই আইনজীবীকে মামলা সংক্রান্ত একটি নীল কাগজ তাকে প্রদান করেন।
ওই ভিডিওর ৪০ সেকেন্ডে দেখা যায়, আদালতের এজলাসের পাশে নিজ চেয়ারে বসে আছেন পেশকার রবিউল্লাহ। এ সময় জনৈক ব্যক্তি তাঁকে টাকা দিতে দেখা যায়। এ সময় তিনি আরো কিছু টাকা দাবি করলে পুনরায় ওই ব্যক্তি টাকা দেন। চেয়ারে বসে দুই দফায় তিনি টাকা নেন এবং অফিসের ড্রয়ার খুলে একটি কাগজের নিচে টাকাগুলো ঢেকে রাখেন।
পরে ড্রয়ারটি বন্ধ করে দেন।
এদিকে আদালতের এজলাস কক্ষে অবস্থান করে টাকা নেওয়ার এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সূত্র জানায়, বিষয়টি নজরে আসায় ইতিমধ্যে আদালতের পেশকার ও অফিস সহায়ককে শোকজ করা হয়েছে। এরপর উভয়ে লিখিত জবাব সংশ্লিষ্ট আদালতে দাখিল করেছেন।
টাকা নেওয়া ও ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে পেশকার রবিউল্লাহ জানান, কে ভিডিওটি ধারণ করেছে বা ছড়িয়েছে, তা আমার জানা নেই।
বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি। এ ঘটনায় তাকে শোকজ করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে লিখিত জবাব দিয়েছি। তবে অপর অভিযুক্ত অফিস সহায়ক ফারুক হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আইনজীবী বলেন, প্রকাশ্যে ঘুষ নিয়ে ভাইরাল হওয়া আদালতের দুই কর্মচারীর বিষয়ে আগেও এমন বেশ কিছু অভিযোগ ছিল। এখন ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় তাদের ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি এখন আদালতপাড়ায় সবার মুখে মুখে। তাই আদালতের সম্মান রক্ষায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছেন আইনজীবীরা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পেশকার রবিউল্লাহ ২০০৫ সালের দিকে একই আদালতের সেরেস্তা শাখায় সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। এরপর পদোন্নতি পেয়ে একই আদালতে উচ্চমান সহকারী পদে প্রেষণে থেকে যান। টানা ২০ বছর একই আদালতে থাকাবস্থায় ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল সিনিয়র সহকারী জজ চান্দিনা আদালতে বদলি হন। সেখানে যোগদানের ৬ মাসের মাথায় পুনরায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বদলী হয়ে পেশকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঘুরেফিরে টানা ২১ বছর ধরে প্রভাব বিস্তার করে একই আদালতে চাকুরি করা এবং প্রকাশ্য আদালতে ঘুষ গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। এদিকে একই আদালতের অফিস সহায়ক ফারুক হোসেন ২০১৭ সালের ১৯ জুন চাকুরিতে যোগদান করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন আদালতে দায়িত্ব পালন করে সর্বশেষ ২০২১ সালের ১১ আগস্ট জেলা ও দায়রা জজ আদালতে যোগদান করে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল হান্নান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে পেশকার ও অফিস সহায়ককে শোকজ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তারা লিখিত জবাব দিয়েছেন। এ ঘটনায় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লার আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. কাইমুল হক রিংকু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ভিডিও ভাইরালের বিষয়টি আমি জেনেছি। তারা জজ আদালতের স্টাফ। দুজনকে শোকজ করার কথাও শুনেছি। তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার ওই আদালতের।’
বাংলাদেশ সময়: ২১:৫৭:২০ ১১ বার পঠিত