হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি : বাড়ছে উদ্বেগ

প্রথম পাতা » জাতীয় » হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি : বাড়ছে উদ্বেগ
রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬



হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি : বাড়ছে উদ্বেগ

জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে আসা বিএনপির কাছে জনগণের আকাশসম প্রত্যাশা। মব, সন্ত্রাস, দখল, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের মাধ্যমে সমাজে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারও কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অপরাধ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। তবে সরকার গঠনের দুই সপ্তাহ না পেরোতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণসহ নানা অপরাধের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সর্বশেষ দুটি ঘটনায় মানুষ শঙ্কা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় কিশোরীকে ফের অপহরণ করে ধর্ষণ ও খুন এবং পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদিকে খুন করে নাতনিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দিকটি সামনে আসছে। খুন-ধর্ষণের ঘটনা ছাড়াও চাঁদাবাজি এবং চাঁদার জন্য চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীর বাসায় গুলির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে জনরোষের সৃষ্টি হবে। কেননা অর্থনীতি বা অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাদের মতে, সরকারের অগ্রধিকারের তালিকায় শীর্ষে রাখতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। না হলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে সরকারকে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে অপরাধ কমে আসবে। কমিউনিটি পুলিশিং, বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করে সামাজিকভাবে অপরাধীদের বিচার করার ওপরও জোর দেন তারা।

মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান লিটন গণমাধ্যমকে বলেন, সাম্প্রতিককালে যে নৃশংস ঘটনাগুলো আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে-বিশেষ করে নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলো যে পরিমাণ বেড়েছে, এর মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুধাবন করা যায়। এটিকে স্বস্তিদায়ক বলার কোনো সুযোগ নেই। যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এটি আইনশৃঙ্খলার জন্য শোভনীয় কোনো বিষয় না।

তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরে ক্রমান্বয়ে এ অপরাধমূলক ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এর মধ্যে কিছু কিছু ঘটনার সুরাহা হলেও এমন কোনো বার্তা সমাজে দিতে পারেনি যে ওই বার্তার কারণে দুষ্কৃতকারীরা এ ধরনের ঘটনা থেকে বিরত থাকবে। দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে, তা না হলে সমাজে এ অপরাধ দিনকে দিন বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ধর্ষণ, অপহরণ কিংবা দলীয় সংঘাত সহিংসতাসহ বীভৎস প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে জঘন্য ও গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, এর সংখ্যাও বাড়ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অন্যতম বিষয় আইনের কঠোর প্রয়োগ। তবে এক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ঘাটতি আছে। আমরা আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে পারছি না। রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থের ক্ষমতা ব্যবহার করে অপরাধকে অনেকটা নরমালাইজ বা সহনশীল করা যায়-সমাজে এমন একটি ধারণা আছে। ফলে অপরাধীদের বড় একটি অংশ মনে করে, অপরাধ করে তারা পার পেয়ে যেতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, আইনের প্রয়োগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিলম্বিত হয়। ভুক্তভোগী যদি প্রান্তিক বৈশিষ্ট্যের কোনো মানুষ হন, তাহলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের হুমকির মুখোমুখি হয়ে থাকেন। কিংবা আইনের আশ্রয় না নিতে নানাজন প্রভাবিত করেন। তাকে কিছু অর্থ দিয়ে বা নানা ধরনের হুমকি দিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত রাখেন। সুতরাং অপরাধীকে যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

জানা যায়, নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের শিকার এক কিশোরী বিচার চাওয়ায় ফের ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। বুধবার রাতে বাবার কাছ থেকে ওই কিশোরীকে অপহরণ করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি বখাটে হিসাবে পরিচিত নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয় তরুণ ওই কিশোরীর মুখ চেপে ধরে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনার পর বিচার চেয়ে নিহতের পরিবার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও ৯নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আহাম্মদ আলী ওরফে আহাম্মদ দেওয়ানের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু সেখানে বিচার পাননি।

ভুক্তভোগী পরিবাররের অভিযোগ, বিচার চাইতে গেলে ধর্ষক ও তাদের সহকর্মীরা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে মিটমাট করার চেষ্টা করে। ওই সময় রফাদফা না হওয়ায় ধর্ষণের শিকার কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন সালিশ বৈঠকের বিচারক মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহাম্মদ আলী।

পরে বুধবার রাতে মেয়েকে খালার বাড়িতে রাখতে যাওয়ার পথে বিলপাড় এলাকায় নূরার নেতৃত্বে ছয় তরুণ ওই কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে যান। পরদিন সকালে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার মাঝামাঝি একটি সরষেখেত থেকে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার হয়। মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ধর্ষণের তথ্যটি আমারা জানতে পারিনি। পাঁচ থেকে সাতজন মিলে যে গ্রাম্য সালিশ বসেছিল, সেটিও আমরা জানতাম না।’

এদিকে বুধবার রাতে রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকায় বাসার সামনে শাহরিয়ার শারমিন বিন্তি (১৪) নামের অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

শুক্রবার রাতে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় নির্মমভাবে খুন হয়েছেন দাদি ও তার কিশোরী নাতনি। শনিবার সকালে উপজেলার ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির পাশের সরিষাখেত থেকে উদ্ধার করা হয় কিশোরীর বিবস্ত্র লাশ। নিজ বাড়ির উঠান থেকে ওই কিশোরীর দাদি সুফিয়া খাতুনের (৬৫) রক্তাক্ত লাশও উদ্ধার করা হয়। ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুজ্জামান জানান, বৃদ্ধাকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। পরে কিশোরীকে পাশের সরিষাখেতে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে রেখে যায়।

শুক্রবার রাতে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর ইউনিয়নের সিপাইপাড়া গ্রামে এরশাদ আলী (৬৫) নামে এক বিএনপি নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি ইউসুফপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি। অভিযোগ উঠেছে, দলের আরেক পক্ষের হামলায় তিনি খুন হন।

শনিবার মোটা অঙ্কের চাঁদার জন্য চট্টগ্রামে পুলিশি পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। ২ জানুয়ারিতেও ওই বাসায় গুলি করেছিল সন্ত্রাসীরা।

এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর রমনা মডেল থানাধীন শান্তিনগর মোড় এলাকা থেকে অপহরণ হন স্কুলছাত্র আফনান সাঈদ। অপহরণকারীরা ছাত্রের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার মায়ের কাছে ৫০ হাজার টাকা চান। ছাত্রের বাবা কোনো উপায় না দেখে সচিবালয়ে চাকরি করার সুবাদে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে উদ্ধারের জন্য নির্দেশনা দেন। স্বল্পসময়ের মধ্যে স্কুলছাত্রকে উদ্ধার করে পুলিশ। প্রধানমন্ত্রীর এমন তৎপরতা সর্বমহলে প্রশংসিতও হয়।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম গণমাধ্যমকে বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এসব অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব। যখন অপরাধীদের শাস্তি হবে, তখন সমাজে মেসেজ যাবে অপরাধ করলে শাস্তি হবে। আর যদি মেসেজ যায় এমনসব অপরাধ করলে টাকা দিয়ে আপস করা যায়, কোর্টে ঘুস দিয়ে বের হওয়া যায়, তাহলে এগুলো বন্ধ হবে না।

তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে ত্বরিত গ্রেফতার, আলামত সংগ্রহ করে সঠিকভাবে দ্রুত তদন্ত ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হলে অন্য কেউ পরবর্তী সময়ে এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না।

অইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা সঠিক ধারায় প্রবাহিত করতে পারিনি। বাহিনীগুলোর মনোবল বৃদ্ধি করতে পারিনি, তাদের উৎসাহিতও করিনি। তাদের ভালো করানোর জন্য ইন্টারেকশনও হয়নি। একটি হযবরল অবস্থার মধ্যে এখনো আছে। পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট এছে, এতে কিছুটা ল অ্যান্ড অর্ডার উন্নতি হয়েছে।

পুলিশের একার পক্ষে এসব অপরাধ দমানো কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ সব জায়গা কাভার করতে পারে না। পুলিশ আর পাবলিক মিলে অপরাধীদের দমন করতে হবে। পুলিশ, পাবলিক, জুডিশিয়ারকে ইকুয়ালি রেসপন্স করতে হবে। তাহলে সমাজ ভালো থাকবে। কমিউনিটি পুলিশিং, বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা কোনো কঠিন কাজ নয় বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক এই আইজি।

বাংলাদেশ সময়: ১৭:৪০:৪৯   ১৪ বার পঠিত  




জাতীয়’র আরও খবর


হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি : বাড়ছে উদ্বেগ
সেনাবাহিনীর আরও ৬ উচ্চ পদে রদবদল
মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ করে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগে আইনি নোটিশ
জনপ্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান
ডিজিএফআই-এর নতুন মহাপরিচালক কায়ছার রশীদ চৌধুরী
লিটু নামের সেই ছেলেটি এখন আইনমন্ত্রী
১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
আরও ১২০২টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
হাইকোর্টের ২ বিচারপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেসব নির্দেশনা আইন মন্ত্রণালয়ের

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ