মেয়ে কামারের চিকিত্সার জন্য গাজা ছাড়ার পর থেকে ফিলিসি্তনি মা হুদা আল কুর্দি এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তঁার সঙ্গে আছে মেয়ে কামার ও ছেলে ওমর। কিন্তু গাজায় স্বামীর সঙ্গে আটকে আছে অপর সন্তান তালিন। যুক্তরাষ্ট্রে দুই সন্তান শিক্ষা ও চিকিত্সার সুযোগ পেলেও নিজের বিধ্বস্ত পরিবার মনকে দ্বিখণ্ডিত করে রাখে তার। গাজায় চলমান গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ হুদা আল কুর্দির পরিবারকে কিভাবে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে সে বর্ণনায় দিয়েছেন দ্য নিউ আরবকে। তিনি জানান, ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর কামার গুরুতর আহত হওয়ার পর তার চিকিত্সার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেদিনই ছিল তার ষষ্ঠ জন্মদিন। প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ও ওষুধের অভাবে তার পায়ে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর এক সপ্তাহের মাথায় ১২ ডিসেম্বর তার পা কেটে ফেলতে হয়। গাজার অন্য অনেক পরিবারের মতো হুদাও উত্তর গাজার জাবালিয়ায় স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল জীবনযাপন করতেন। গণহত্যা শুরু হওয়ার পর ব্যাপক বোমাবর্ষণের কারণে হুদা ও তার পরিবার জাতিসংঘের ফিলিসি্তনি শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ ও কর্ম সংস্থা (UNRWA) পরিচালিত একটি আশ্রয়কেন্দ্রে পালিয়ে যায়। তবে বিশেষ প্রয়োজনে তঁাকে মাঝেমধ্যে কিছু জিনিসপত্র সংগ্রহের জন্য বাড়িতে ফিরে যেতে হতো। এমনই এক সফরে তিনি সন্তানদের সঙ্গে নিয়েছিলেন। তখনই নির্বিচার বোমাবর্ষণ শুরু হয়। হুদা বলেন, বাসিন্দারা যেন সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয় সেজন্য ট্যাংকগুলো নির্বিচারে বাড়িঘর ও চারপাশে গোলাবর্ষণ শুরু করে। প্রথম গোলাটি যখন আঘাত হানে, তখন কী ঘটছে তা আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু প্রায় তৃতীয় গোলাটি পড়ার পর বুঝতে পারি যে আমাদের ওপর বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। চারদিকে চিত্কারের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আমি আমার শরীরে জ্বালাপোড়া অনুভব করতে শুরু করি। আমার পিঠে আঘাত লেগেছিল। বোমাবর্ষণ চলতে থাকায় হুদা সর্বশক্তি দিয়ে চিত্কার করতে করতে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তার ছেলে ওমর এবং মেয়ে তালিনকে বের করে আনেন। তিনি বলেন, আমি কীভাবে তাদের বহন করে সেখান থেকে বের করে এনেছিলাম, তা জানি না। মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে তালিন আমার কোলে অচেতন হয়ে পড়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, সে হয়ত মারা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আমাকে সাহায্য করতে ছুটে আসেন। তারা তালিনকে নিয়ে নেন। আর আমি কামারকে উদ্ধার করতে আবার ভবনের ভেতরে ফিরে যাই। সে গুরুতর আহত হয়েছিল। আমি এক হাতে তাকে টেনে বের করি এবং অন্য হাতে তার পা ধরে রাখি, কারণ তখনো পাটি পুরোপুরি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। হুদা জানান, চলমান ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের কারণে অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পঁেৌছাতে পারেনি। স্থানীয় বাসিন্দারা বঁেচে যাওয়া মানুষদের সাহায্য করার চষ্টো করেন এবং একটি গাড়ি ও ঘোড়ার সাহায্যে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। আহত হওয়ার পরপরই হুদা তার মেয়ে কামার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কামার তার বাবার সঙ্গে আল-আওদা হাসপাতালে থেকে যায়। অন্যদিকে হুদা তার দুই সন্তান ওমর ও তালিনকে নিয়ে উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে চলে যান। কামারের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিত্সাসামগ্রীর সংকটের কারণে চিকিত্সকদের কামারের একটি পা কেটে ফেলতে বাধ্য হতে হয়। হুদা জানান, পা কেটে ফেলার পর কামারের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয় এবং তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। উত্তর গাজার পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়লে হুদা আবারো তঁার তিন সন্তানকে নিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ গাজায় পালিয়ে যান। এবার তঁাদের বাবা সঙ্গে ছিলেন না। কারণ হুদা আশঙ্কা করছিলেন, তঁার স্বামীকে আটক ও গ্রপ্তোর করা হতে পারে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে মার্চ পর্যন্ত চলা যুদ্ধবিরতি হুদাকে কামার ও ওমরকে নিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে চিকিত্সা-উচ্ছেদ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজা থেকে বের হওয়ার সুযোগ করে দেয়। হিল প্যালেস্টাইনের সংস্থার সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রে পৌছায়। তবে নতুন পরিবেশ গাজার সেই অভিজ্ঞতাগুলো কামারের মন থেকে মুছে দিতে পারেনি। হুদা বলেন, তাঁর মেয়ে এমন অনিদ্রায় ভুগছে, যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন। গণহত্যার প্রভাব শুধু কামারের শারীরিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর স্মৃতিও তিনি এখনো বহন করে চলেছেন। এই মানসিক ভার আরো কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ হুদা এখন তাঁর পরিবারের একটি অংশ থেকে দূরে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, তিনি যেন একই সঙ্গে দুটি জীবন যাপন করছেন। তাঁর জীবনের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে, আর অন্য অংশটি গাজায় তাঁর স্বামী ও মেয়ে তালিনের সঙ্গে। সেখানে তারা এমন দিনও পার করেছে, যখন বোমাবর্ষণের পাশাপাশি তাদের কাছে খাবার কিংবা আশ্রয় কোনোটিই ছিল না। তিনি পরিস্থিতির উন্নতি হলে দেশে ফিরে যেতে চান। তার মতে, আমাদের দেশ বরকতময়। প্রতিবেশীরা একে অপরের দেখাশোনা করে। আমরা নিজেরাই খাদ্য উত্পাদন করি এবং নিজেদের জমির উত্পাদিত খাবার খাই। আমি আমার পরিবার ও সন্তানদের সঙ্গে নিরাপদে বসবাস করতে চাই। সূত্র: দ্য নিউ আরব news24bd.tv /DHL
বাংলাদেশ সময়: ১৪:২১:৪৩ ৬ বার পঠিত #একজন #গণহত্যায় #পরিবার #ফিলিস্তিনি #বিধ্বস্ত