
মো: মনজু, মিরপুর প্রতিনিধি :
রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন বস্তিতে প্রকাশ্যে চলছে অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের রমরমা বাণিজ্য। জাতীয় সম্পদ চুরি করে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরছে একশ্রেণীর অসাধু চক্র। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও তাদের ছত্রছায়ায় থাকা পাতি নেতারা। ফলে একদিকে যেমন সরকার হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব, অন্যদিকে বস্তিবাসী সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত দামে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহার করছেন এসব ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিস্তৃত জাল অনুসন্ধানে
জানা গেছে, মিরপুরের রূপনগর, দুয়ারীপাড়া, ভাষানটেক, কল্যাণপুর পোড়াবস্তি এবং ১০ নম্বর সেকশনের বিভিন্ন বস্তিতে এই অবৈধ কারবার সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একশ্রেণীর নেতাকর্মী নিজস্ব লাইনম্যানের মাধ্যমে প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক দল ক্ষমতার রদবদল হলেও পরিবর্তন হয় না এই সিন্ডিকেটের হাত। শুধু হাতবদল হয় চাঁদার হাত। প্রতিটি অবৈধ বিদ্যুৎ মিটারের বা লাইনের জন্য বস্তিবাসীদের কাছ থেকে ক্ষেত্রভেদে মাসে ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকা এবং অবৈধ গ্যাস বার্নারের জন্য ১,০০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। কোনো কোনো বস্তিতে এক একটি লাইনের মাসিক চুক্তি হাজার টাকার ওপরে। টাকা দিতে সামান্য বিলম্ব হলেই কেটে দেওয়া হয় সংযোগ, এমনকি সইতে হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
যেভাবে চলে বিদ্যুতের ‘লাইন বাণিজ্য’
ডেসকো (DESCO) বা বিদ্যুৎ বিভাগের মূল সংযোগ লাইন থেকে অভিনব উপায়ে ‘হুকিং’ করে বস্তিতে বিদ্যুৎ নেওয়া হয়। বস্তির নির্দিষ্ট পথগুলোতে ঝুলন্ত তারের জঙ্গল যেন এক একটি মরণফাঁদ। কোনো ধরনের নিরাপত্তা ছাড়াই সাধারণ তার দিয়ে হাজার হাজার ঘরে দেওয়া হয়েছে এই বিদ্যুৎ। অনুসন্ধানে জানা যায়, ডেসকোর কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশেই লাইনম্যানরা এসব সংযোগ দেওয়ার সাহস পায়। প্রতি মাসে কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি হলেও খাতাপত্রে তা দেখা যায় ‘সিআইপি’ বা সিস্টেম লস হিসেবে।
সিলিন্ডারের দামেও মেলে না সরকারি গ্যাস, বস্তিতে শত শত চুলা
তিতাস গ্যাসের সংযোগ ডাইরেক্ট বাইপাস করে বস্তির মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া হয়েছে ছোট ছোট প্লাস্টিক পাইপ। একটাই মেইন লাইন থেকে শত শত ঘরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে গ্যাস সংযোগ। এসব সংযোগ এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের বিস্ফোরণ। বিগত দিনে মিরপুরের বিভিন্ন বস্তিতে লাগা বেশ কয়েকটি ভয়াবহ আগুনের পেছনে এসব লিক হওয়া অবৈধ গ্যাস লাইনকেই দায়ী করেছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রূপনগর বস্তির এক বাসিন্দা জানান, “আমরা তো বৈধ সংযোগ চাই। কিন্তু বাড়িওয়ালার মাধ্যমে রাজনীতির বড় ভাইদের নির্ধারিত মানুষকে টাকা দিতে হয়। না দিলে বস্তিতে থাকা যাবে না। আমরা এক প্রকার জিম্মি।”
একই সুর ভাষানটেকের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর গলায়। তিনি বলেন, “লাইন দেওয়ার মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ওদের সাথে কথা না বলে বস্তিতে এক ফুট তারও কেউ টানতে পারে না।”
প্রশাসনিক নীরবতা ও কর্তৃপক্ষের দায়
নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তিতাস ও ডেসকোর পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ছোটখাটো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার তৈরি হয় নতুন লাইন। স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, মূল হোতা ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা অসম্ভব।
বাংলাদেশ সময়: ২১:০৭:০৫ ৯ বার পঠিত