![]()
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের একাধিক মামলা ও অভিযোগের বিচার কার্যক্রম চলছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অপরাধের অভিযোগ করা হয়েছে। তিন হাজারের বেশি নেতাকর্মী ও ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, র্যাব ও পুলিশের সাবেক সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। সাক্ষ্যগ্রহণে আসামিদের বিরুদ্ধে সে সময় সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিভিন্ন বর্ণনা উঠে এসেছে।
ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চারটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ এবং দুটি মামলা অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে থাকা চারটি মামলা হলো—টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল (টিএফআই সেল), জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি), মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুমের মামলা এবং ছাত্রদল-জাসাসের দুই নেতাকে ‘ক্রসফায়ার’-এ হত্যার মামলা। প্রসিকিউশনের ভাষ্য, সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে টিএফআই সেলে গুম, জেআইসি সেলে গুম এবং জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ—এই তিন মামলার রায় হতে পারে। টিএফআই সেলে গুমের ঘটনায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জন আসামি। অন্যদিকে জেআইসি সেলে গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
১২ মে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম, ক্রসফায়ার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ৩ হাজার ২৯৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনটি পৃথক আবেদন করে বিএনপি। বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামকে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আবেদনগুলো জমা দেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও দলটির মামলা, গুম, খুন ও তথ্য সংরক্ষক সমন্বয়ক মো. সালাহ উদ্দিন খান। আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও পুনরায় দাখিল করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গুম, ক্রসফায়ার ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে গুম হওয়া শত শত পরিবারের সদস্য তদন্ত ও বিচারের আশায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে তাকিয়ে আছেন। তারা তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন দপ্তরে নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন। কেউ কেউ বিলম্বে হতাশা ও ক্ষোভও প্রকাশ করছেন। এ প্রেক্ষাপটে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা গুমের অভিযোগ তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়ায় কতদূর অগ্রসর হয়েছে, সে বিষয়ে গণমাধ্যম তথ্য সংগ্রহ করেছে।
প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী গণমাধ্যমকে বলেন, গুমের মামলাগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একজন সাক্ষীকে ১৭ জন আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, ফলে সময় লাগছে। তিনি বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষকে জেরার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি তিনি দেখছেন না। রায় কবে হতে পারে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে আশা করছি চলতি বছরের মধ্যেই এসব মামলার বিচার নিষ্পত্তি হবে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর) আনসার উদ্দিন খান পাঠান মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বলেন, ইতোমধ্যে ৬-৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে। আরও কতজন সাক্ষ্য দেবেন—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি প্রসিকিউশনের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত শেখ হাসিনার আইনজীবী আমির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, গুম-খুনের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে অনেকেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে গুমের সব ঘটনা সঠিক নয়।
টিএফআই সেল : এ সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জন আসামি। এর মধ্যে ১০ জন গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন—ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রথম সাতজন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং শেষের তিনজন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ সাত আসামি পলাতক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। ১৪ জুন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গণীর মৃত্যু এবং আরেক আইনজীবীর অসুস্থতার কারণে সময়ের আবেদন করা হলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন।
জেআইসি : এ সেলে গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন আসামি গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন—প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামি পলাতক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। ১৮ জুন এ মামলায় ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন হেফাজতে ইসলামের কর্মী তাজুল ইসলাম। তিনি একসময় মানিকগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জুলুম-নির্যাতন এবং হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে গণহত্যা নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করায় ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর রাতে মানিকগঞ্জের ওই মাদ্রাসা থেকে তাকে গুম করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান : ১৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
২২ জুন এ মামলায় পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ইমরুল কায়েস। তিনি বর্তমানে রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন।
ছাত্রদল-জাসাসের দুই নেতাকে ‘ক্রসফায়ার’ : ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘ক্রসফায়ার’-এ নিহত হন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা। এ মামলায় চারজন আসামি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) একেএম এহসানউল্লাহ পলাতক। অপর দুই আসামি বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
কল্যাণপুরে জাহাজবাড়িতে ‘জঙ্গি নাটক সাজিয়ে’ ৯ তরুণকে হত্যা : ২০১৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ঢাকার কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে ‘জঙ্গি নাটক সাজিয়ে’ ৯ তরুণকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ আটজনকে আসামি করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম।
পাতারটেকে কথিত ‘জঙ্গি আস্তানা’ নাটক সাজিয়ে সাতজনকে হত্যা : ২০১৬ সালে গাজীপুরের পাতারটেক এলাকায় কথিত ‘জঙ্গি আস্তানা’ নাটক সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সাবেক কর্মকর্তাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশন অভিযোগটি দাখিল করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আলোচিত এ ঘটনায় প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—ডিএমপির সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তৎকালীন প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী এবং ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া।
বাংলাদেশ সময়: ১২:০৯:৪৭ ১৭ বার পঠিত