![]()
মোঃ আব্দুল্লাহ হক, চুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজ’-এ নিয়োগ বাণিজ্যের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার কলেজের নিজস্ব ফান্ড থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। কলেজের অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টে খোদ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের ১৯,৯৫,৬২৫ (উনিশ লক্ষ পঁচানব্বই হাজার ছয়শত পঁচিশ) টাকা সরাসরি পকেটস্থ করার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ধামাচাপা দিতে পরিচালনা পর্ষদের গভর্নিং বডির সভাপতি ও অধ্যক্ষের চরম টালবাহানা ও সময়ক্ষেপণে স্থানীয় সচেতন মহল, শিক্ষক-কর্মচারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কলেজের সার্বিক আর্থিক হিসাব নিরীক্ষার জন্য গঠিত অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টে এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতি উন্মোচিত হয়। মাত্র ২১ মাসের ব্যবধানে কলেজের ফান্ড থেকে এই বিশাল অংকের টাকা নিয়মনীতি বহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত বিভিন্ন ব্যাংক-এনজিও লোন পরিশোধে এবং নিজ হেফাজতে রেখে আত্মসাৎ করেছেন অধ্যক্ষ। গত ১১ জুন কলেজের শিক্ষক মিলনায়তনে অডিট প্রতিবেদনটি সর্বসম্মুখে উপস্থাপন করা হয়। এরপর অর্থ ফেরত দেওয়া অথবা কোনো আপত্তি থাকলে তা লিখিতভাবে জানাতে ১০ কার্যদিবসের কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। গত ২৪ জুন সেই সময়সীমা পার হয়ে গেলেও অধ্যক্ষ টাকা ফেরত দেননি, এমনকি কোনো আইনি জবাবও দিতে পারেননি। উল্টো গভর্নিং বডির সভাপতি ইউসুফ হাসানের প্রত্যক্ষ মদদে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কলেজটিতে অধ্যক্ষ ও সভাপতির সিন্ডিকেটের লুটপাটের পরিধি কতটা বিস্তৃত, তা অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে।
অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা ও ভর্তি উপকমিটির সদস্যদের কোনো প্রকার সম্মানি বা ভাতা না দিয়েই কাগজে-কলমে তা সম্পূর্ণ পরিশোধ দেখিয়ে পুরো টাকা পকেটস্থ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করা হলেও সেই বিক্রয়লব্ধ টাকা কলেজের মূল অ্যাকাউন্টে জমা না করে সরাসরি ভাগাভাগি করে নিয়েছেন অধ্যক্ষ ও সভাপতি। এমনকি রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উদযাপন না করেই শুধুমাত্র ভুয়া ভাউচার তৈরি করে পুরো বাজেট আত্মসাৎ করার মতো ধৃষ্টতা দেখানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ক্রয়, অর্থ বা উন্নয়ন কমিটি থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি, যার ফলে কলেজের যাবতীয় কেনাকাটার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ কোনো দরপত্র ছাড়াই ভুয়া বিলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়াও নির্দিষ্ট দিনগুলোতে সশরীরে কলেজে উপস্থিত থেকেও খুলনা আঞ্চলিক অফিস ও ঢাকায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের নামে ভুয়া টিএ/ডিএ বিল তোলা হয়েছে এবং কোনো অভিভাবক সমাবেশ না করেই ভুয়া খরচের ভাউচার তৈরি করা হয়েছে।
আর্থিক দুর্নীতির অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ মিলেছে হিসাব-নিকাশের খাত পরিবর্তনের মাধ্যমে। কলেজের ডিগ্রি শাখা থেকে প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের সেশন ফি, ভর্তি ও ফরম পূরণ বাবদ মোটা অঙ্কের আয় হলেও তা মূল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে না নিয়ে সম্পূর্ণ গোপন করা হচ্ছে। অথচ ডিগ্রি শাখার যাবতীয় প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো হচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক শাখার সাধারণ তহবিল থেকে। সবচেয়ে নজিরবিহীন জালিয়াতি করেছেন গভর্নিং বডির সভাপতি ইউসুফ হাসান। অভিযোগ উঠেছে, তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিজের কার্যভার বা দায়িত্ব গ্রহণ করার পূর্ববর্তী তারিখে অর্থাৎ ব্যাকডেটে কলেজের বিভিন্ন খরচের বিল ও ভাউচারে সই করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার আগেই আর্থিক নথিপত্রে এই বেআইনি স্বাক্ষর তার সরাসরি অংশীদারিত্বকেই প্রমাণ করে। মূলত শিক্ষার্থীদের সেশন ফি, ভর্তি ফি, ফরম পূরণ, টিউশন ফি, কলেজের স্থায়ী আমানতের লভ্যাংশ এবং কলেজের নিজস্ব সম্পত্তির লিজ থেকে অর্জিত আয়ের একটি বিশাল অংশ কলেজের মূল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা না করে এই চক্রটি জাল ভাউচারের মাধ্যমে লুটে নিয়েছে।
এর আগে এই বিতর্কিত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কলেজটিতে বড় ধরনের নিয়োগ ও শিক্ষক কর্মচারীদের প্রমোশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল, যা নিয়ে সে সময় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নিয়োগ বাণিজ্যের সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল লোপাটের এই ঘটনা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। এদিকে অডিট কমিটির এই বিস্ফোরক রিপোর্টের পর কলেজে এক ধরনের অরাজকতা ও ভীতি তৈরি করা হয়েছে। হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতা দাবি করায় এবং অডিট রিপোর্ট বাস্তবায়নের চাপ সৃষ্টি করায় সাধারণ শিক্ষক ও কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির হুমকি ও প্রশাসনিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অডিট রিপোর্টের চাঞ্চল্যকর তথ্য, নিয়োগ বাণিজ্য এবং টাকা ফেরত না দেওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, সবকিছু নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। আগামী ২ তারিখে সব জানতে পারবেন। তিনি আরো বলেন আমার আর ৪মাস চাকরি আছে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
গভর্নিং বডির সভাপতি ইউসুফ হাসানের সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি, ফলে এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এলাকার ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং লুণ্ঠিত টাকা দ্রুত উদ্ধার করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও এলাকার সচেতন মহল। দুর্নীতিগ্রস্ত অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি এখন সাধারণ মানুষের।
বাংলাদেশ সময়: ২০:১৩:৪০ ১০ বার পঠিত