
সংবিধান অনুসারে সাতষট্টি বছর পূর্ণ হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম অবসরে গেছেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) কর্মদিবসের শেষ দিন তাকে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে বিদায়ী সংবর্ধনা জানানো হয়।
এসময় প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতিরাসহ অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন উপস্থিত ছিলেন।
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, আজ আমার বিচারিক জীবনের একটি বিশেষ দিন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দুই দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর আজ আমি অবসর নিচ্ছি। তবে আমি এটিকে শুধু বিচারিক জীবনের সমাপ্তি হিসেবে দেখি না। আমি দেখি, আইনাঙ্গনে চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে।
তিনি বলেন, আমি একটি কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। বিচার বিভাগ শুধু বিচারকদের নয়। শুধু আইনজীবীদেরও নয়। এই বিচার বিভাগ আমাদের সবার। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী-আমরা সবাই এই প্রতিষ্ঠানের অংশ। আমরা যদি সবাই বিচার বিভাগকে নিজের প্রতিষ্ঠান বলে মনে করি, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। বিচার বিভাগের শক্তি একা কোনো বিচারকের শক্তি নয়, একা কোনো আইনজীবীরও নয়। এটি আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। তাই ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একসঙ্গে কাজ করবে-এই প্রত্যাশা করি।
বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে নয় উল্লেখ করে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, অবসর গ্রহণ আমার কাছে কোনো সমাপ্তি নয়। এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে নয়। যতদিন সামর্থ্য থাকবে, ততদিন দেশের কল্যাণে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের উন্নয়নে আমার অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য দিয়ে অবদান রাখার চেষ্টা করব।
নবীন আইনজ্ঞদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সততা। এরপর তার চরিত্র। আর তারপর তার অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। আইনজ্ঞ হতে গেলে শেখার কোনো শেষ নেই। তাই নিয়মিত পড়তে হবে। সংবিধান পড়তে হবে। আইন পড়তে হবে। দেশি-বিদেশি রায় পড়তে হবে। বিচারতত্ত্ব জানতে হবে। যত বেশি পড়বেন, তত বেশি সমৃদ্ধ হবেন। বই হাতের কাছে না পেলে প্রয়োজনে তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনেই পড়ে ফেলতে হবে।
আমাদের বিচার বিভাগের সামনে আগামী দিনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে। মামলার জট কমাতে হবে। বিচারকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বিচার বিভাগকে আরও দক্ষ, আরও আধুনিক এবং আরও সেবামুখী হতে হবে। বিচার শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই যথেষ্ট নয়; মানুষকেও তা দেখতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে বিচার হয়েছে। বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা। সেই আস্থা রক্ষা করাই আমাদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘অভিজ্ঞ বিচারপতিরা অবসরে চলে যাচ্ছেন। এছাড়া আমাদের অনেক সিনিয়র আইনজীবী মৃত্যুর মাধ্যমে আমাদের মাঝ থেকে একেবারে হারিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে বিচার বিভাগে, আইনাঙ্গনে শূন্যতা বিরাজ করছে। ’
তিনি আরও বলেন, ‘বার কাউন্সিলে আমরা অতি সম্প্রতি যে পরীক্ষা নিয়েছি, সেখানে সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে মেধাবীদেরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছি। এই পেশায় যদি সততা, অধ্যবসায় না থাকে তাহলে এই পেশায় কেউ ভালো করতে পারে না। সবাই কেমন যেন শর্টকার্ট রাস্তায় অর্থবিত্তের মালিক হতে চায়। জ্ঞান অর্জন করতে চায় না। আমাদের প্রয়োজন জ্ঞান অর্জন করা। ’
তিনি আরও বলেন, আমি যখন আইন পেশার শুরুতে যে সমস্ত বিচারপতিদের সামনে দাঁড়িয়ে মামলা করতাম আজকে সে ধরনের, সেই মানের নীতি-নৈতিকতার বিচারপতিদের বড্ড অভাব। বার এবং বেঞ্চে আইনজীবীদের মধ্যে এবং বিচারকদের মধ্যে এই যে মেধার যে ঘাটতি রয়েছে, এই মেধার ঘাটতিটাকে কাটিয়ে উঠার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশ সময়: ১:৪০:৫৫ ৯ বার পঠিত