চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ‘তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি, খাবার-পানি নেই’

প্রথম পাতা » প্রধান সংবাদ » চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ‘তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি, খাবার-পানি নেই’
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬



চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ‘তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি, খাবার-পানি নেই’

কোলে ১১ মাসের রফিকুল ইসলাম। বাম হাতে বুকে আগলে ধরে ডান হাতে ছাতা মাথায় নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন বাবা রকিবুল ইসলাম। পেছনে পেছনে যাচ্ছেন স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা। ঘরে পানি উঠে গেছে। নেই খাবার রান্নার সুযোগ। রাতে ঘুমানোর খাটে পানি ছুঁইছুঁই। তাই ঘরে তালা দিয়ে আধ কিলোমিটার হেঁটে স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন তিনি। গতকাল শনিবার বাঁশখালীর মনকিচর এলাকায় হাঁটুপানিতে ডুবে থাকা সড়কে দেখা মেলে এ দৃশ্যের।

একই সড়কে আরেকটু সামনে যেতেই দেখা মেলে দুই যুবক ও এক কিশোরের মাথা ও হাতে চারটি সুপেয় খাবার পানির কলসি। যুবক রাজ্জাক আলী বলেন, ‘আজকে তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি। খাবারের সংকট। সুপেয় পানি নেই। এক কিলোমিটার দূর থেকে কলসিতে করে পানি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছি। সেখানে মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাই কাঁধে একটি ও হাতে একটি—দুই কলসি পানি নিয়েছি। পানি বেড়ে গেলে আর খাওয়ার পানি নিতে যেতে পারব না।’

তাদের মতো পানি বাড়তে থাকায় বাঁশখালীর শেখেরখীল এলাকার ৬২ বছরের নিজাম উদ্দিন লাঠি ভর দিয়ে ছুটছেন আশ্রয়ের খোঁজে। আরেকটু এগিয়ে যেতেই ৫৫ বছরের নাজমা বেগমকে তাঁর ছেলে সাইজুদ্দিনের সঙ্গে সড়কের ডুবে থাকা হাঁটুপানি মাড়িয়েই আশ্রয়কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে ছুটতে দেখা যায়। নাজমা বেগম বলেন, ‘বাবা, বন্যার পানির অবস্থা ভালো নয়। ১৯৯১ সালেও এত পানি দেখিনি। এবার এত পানি কোথা থেকে আসতেছে বুঝতে পারছি না। সকালে ঘরে পানি ঢুকেছে। তাই অবস্থা খারাপ দেখে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাচ্ছি।’

দুর্ভোগ সঙ্গে নিয়ে শনিবার ভোর থেকে এভাবেই আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে দেখা গেছে বহু মানুষকে। এদিকে সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকা গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন। মোবাইল টাওয়ারগুলো অচল হয়ে পড়ায় দুর্গত মানুষেরা যোগাযোগ করতে পারছেন না, যা উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা স্পিডবোট ও লাইফ জ্যাকেট নিয়ে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছেন। উদ্ধারকাজ সুশৃঙ্খল করতে সেনাবাহিনী তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর সদস্যরাও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। বাঁশখালীর চেচুরিয়া এলাকায় ঘরের ভেতর আটকে পড়া এক অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ ১৩ জনের একটি পরিবারকে ফায়ার সার্ভিস অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে।

বাঁশখালীর উপকূলীয় ৮টি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দী। শনিবার সরেজমিনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জলদী সদর, শীলকূপ, গণ্ডামারা, বাহারছড়া ও শেখেরখীল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চলাচলের প্রধান সড়কের কোথাও কোমরপানি, কোথাও হাঁটুপানি। এলাকার পর এলাকা পানিতে ডুবে আছে। যেসব এলাকায় শুক্রবার পানি ওঠেনি, সেসব ঘরবাড়িতেও ঢুকতে শুরু করেছে পানি। তাই মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন।

বাঁশখালীর পূর্ব ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ১২টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, এখনও প্রশাসনের কেউ তাঁদের খবর নেয়নি, কোনো খাবার দেয়নি। সুপেয় পানি নেই; পাঁচ কিলোমিটার দূরের দোকান থেকে পানি কিনে খেতে হচ্ছে।

আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাসা থেকে চাল-আলু নিয়ে এসেছিলাম, সেই খাওয়া শেষ। এখন মুড়ি খেয়ে আছি। এক গ্লাস করে পানি খাচ্ছি। আমার মতো অন্যরাও খাবার কষ্টে আছেন।’

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি ত্রাণের আওটায় আনার চেষ্টা করছি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল ও আড়াই হাজার পরিবারে শুকনো খাবার বিতরণ করেছি। আজ থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়েছে।ব

টানা এক সপ্তাহের অতি ভারী বর্ষণের পর বৃষ্টির তীব্রতা কমলেও বাঁশখালীতে বন্যার অবনতি হয়েছে। সাতকানিয়ায় বন্যার পানি কমছে না। দুই উপজেলায় প্রায় আট লাখ মানুষ পানিবন্দী। মূলত বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকার পানি নেমে আসায় বন্যার পানি কমছে না। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। পানিতে ডুবে সাতকানিয়ার দক্ষিণ রূপকানিয়া এলাকায় দুই বছর বয়সী ইসমাইল হোসেন নামে এক শিশু মারা গেছে।

সাতকানিয়া উপজেলা সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) সামছুজ্জামান বলেন, পরিবারের সদস্যদের অগোচরে শিশু ইসমাইল হোসেন বন্যার পানিতে ডুবে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে উদ্ধার করে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত এলাকায় ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২১ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা বলেন, চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিপাত অনেকটাই কমেছে। এখনও মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টিও হতে পারে।

এদিকে রাঙ্গুনিয়ায় টানা পাহাড়ি ঢলের পানির তীব্র স্রোতে একটি সেতু ধসে পড়ে রাঙ্গুনিয়া হয়ে বান্দরবানের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সেতুর দুই পাশে আটকে পড়েছেন হাজারো যাত্রী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শনিবার ভোররাতে উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া একটি রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির চাপ আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে পানির তোড়ে সেতুটির একটি অংশ ভেঙে পড়ে।

কর্ণফুলী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার লিচুবাগান এলাকা থেকে নদীর অপরপাড়ে চলাচলকারী ফেরি সার্ভিসও বন্ধ রয়েছে। ফলে বিকল্প পথেও বান্দরবানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে বন্যার পানি কিছুটা কমলেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বাড়িঘর, উঠান ও গ্রামীণ সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে আছে। কৃষিজমি ও পুকুর তলিয়ে রয়েছে। ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

বন্যায় ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় শত শত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

শনিবার গুইমারা রিজিয়নের অধীন লক্ষ্মীছড়ি জোনের উদ্যোগে উপজেলার সুন্দরপুর, হারুয়ালছড়ি ও আশপাশের বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেনাসদস্যরা নৌযান ও অন্যান্য উপায়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০টি পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ত্রাণ তুলে দেন।

এদিকে, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চার দিন ধরে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। কবাখালী ও মেরুং ইউনিয়নের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দীঘিনালার সঙ্গে রাঙামাটির লংগদু ও মারিশ্যার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র ৭ হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। চেঙ্গী নদীর পানি কমে যাওয়ায় খাগড়াছড়ি শহরের অধিকাংশ এলাকা থেকে পানি সরে যাচ্ছে। তবে নিচু এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা রয়েছে। বন্যায় কৃষিজমি, সবজিখেত ও পুকুরের মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি, রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি ও ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।

বাংলাদেশ সময়: ১:২২:১৮   ৫ বার পঠিত  




প্রধান সংবাদ’র আরও খবর


আওয়ামী লীগ আমলে ক্রসফায়ারে নিহতদের তথ্য প্রকাশে লিগ্যাল নোটিশ
রাজধানীতে ‎ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার ৭
হোয়াটসঅ্যাপে অভিনব প্রতারণা, অর্থ-তথ্য চুরি
শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ
চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ‘তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি, খাবার-পানি নেই’
পরীমনির প্রশ্ন রাষ্ট্র কি তার দায় নেবে
শেষ মুহূর্তের জাদুকর মিকেল মেরিনো
সচিব কমিটির সুপারিশ সরকারি চাকরিজীবীর বেতন ১০০% পর্যন্ত বাড়তে পারে
একযোগে ৩৮ বিচারককে বদলি
ইকরার মৃত্যু: জামিন মেলেনি অভিনেতা জাহের আলভীর

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ