![]()
স্টেডিয়ামের ঘড়িতে তখন শেষ কয়েক মিনিট। গ্যালারিতে হাজারো মুখে উদ্বেগ, টেলিভিশনের পর্দার সামনে কোটি সমর্থকের বুক ধড়ফড় করছে। হঠাৎ যেন সময় থেমে যায়। নিখুঁত দৌড়, সঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে এক স্পর্শে বল জালে। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। স্পেনের সেই আনন্দের নাম মিকেল মেরিনো।
চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের সাফল্যের গল্পে লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস,ফ্যাবিয়ান রুইজের সঙ্গে আরেকটি নাম আসবে- মিকেল মেরিনো। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল, তারপর বেলজিয়ামের বিপক্ষে বদলি নেমে আবারও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন।
তবে এই গল্পের শুরুটা এত রঙিন ছিল না। ১৯৯৬ সালের ২২ জুন স্পেনের নাভারা অঞ্চলের ঐতিহাসিক শহর পাম্পলোনায় জন্ম মিকেল মেরিনোর। ফুটবল তার রক্তেই মিশে ছিল। বাবা মিগেল মেরিনো ছিলেন স্পেনের পেশাদার ফুটবলার। একসময় ওসাসুনা, সেল্তা ভিগোসহ কয়েকটি ক্লাবের জার্সি গায়ে মাঠ মাতিয়েছেন। ছোট্ট মিকেল বাবার হাত ধরেই প্রথম ফুটবল মাঠে যান। অন্য শিশুরা যখন খেলনায় মগ্ন, তখন মেরিনোর খেলনা ছিল একটি ফুটবল।
ফুটবল পরিবারের সন্তান হওয়া মানেই সবকিছু সহজ ছিল না। বাবার পরিচয় তাকে সুযোগ এনে দিতে পারেনি, প্রত্যাশার চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। সবাই জানতে চাইত, বাবার মতো খেলতে পারবে তো? সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি মুখে দেননি, দিয়েছেন মাঠে।
![]()
ওসাসুনার একাডেমিতে তার বেড়ে ওঠা ছিল ধাপে ধাপে। ২০১৪ সালে ওসাসুনার হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় এই মিডফিল্ডারের।ছয় ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতার এই ফুটবলার যেমন আকাশে শক্তিশালী, তেমনি মাটিতেও বল নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ। রক্ষণে ট্যাকল করতে পারেন, আবার মুহূর্তেই আক্রমণ করতে পারেন। আধুনিক ফুটবলে যাকে বলা হয় ‘বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার’, মেরিনো তারই এক নিখুঁত উদাহরণ।
ডর্টমুন্ডে যাওয়াটা ছিল স্বপ্নপূরণ, সেই স্বপ্নের পথ ছিল কাঁটায় ভরা। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। নিয়মিত একাদশেও জায়গা মিলছিল না। ডর্টমুন্ডে এক মৌসুম কাটানোর পর পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে, নিউক্যাসল ইউনাইটেডে। কঠিন, শারীরিক শক্তিনির্ভর প্রিমিয়ার লিগে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাও সহজ ছিল না। এখানেই মেরিনো আরও পরিণত হন।
নিউক্যাসলের সাবেক কোচ রাফায়েল বেনিতেজ একবার বলেছিলেন, ‘মিকেলের সবচেয়ে বড় গুণ হলো সে শেখার জন্য সব সময় প্রস্তুত।’ ২০১৮ সালে ফিরে আসেন নিজের দেশে, রিয়াল সোসিয়েদাদে। সান সেবাস্তিয়ানের ক্লাবটিতে হয়ে ওঠেন দলের হৃদস্পন্দন। মাঝমাঠে মেরিনো মানেই ছিল আত্মবিশ্বাস। সতীর্থরা জানতেন, চাপের মুহূর্তে বলটা মেরিনোর পায়ে তুলে দিলেই তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।
![]()
রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে তার ছয়টি মৌসুম ছিল ক্যারিয়ারের সোনালি অধ্যায়। ক্লাবকে কোপা দেল রে জিততে সাহায্য করেন। লা লিগার অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন।
স্পেন জাতীয় দলেও ধীরে ধীরে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন তিনি। তার খেলার ধরনটা অন্যরকম। একই সঙ্গে রক্ষণ সামলাতে পারেন, আক্রমণ গড়তে পারেন, আবার প্রয়োজনে গোলও করতে পারেন। এমন বহুমুখী ফুটবলার আধুনিক ফুটবলে খুব বেশি নেই।
২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁর নাম নতুন করে আলোচনায় আসে। জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে করা তার হেডটি স্পেনের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা এক মহাকাব্য।
![]()
এক সাক্ষাৎকারে মেরিনো বলেছিলেন, ‘আমি কখনো ব্যক্তিগত নায়ক হতে চাই না। আমি চাই, ম্যাচ শেষে সবাই বলুক স্পেন জিতেছে।’
২০২৪ সালের পর ইউরোপের অন্যতম বড় ক্লাব আর্সেনাল তাকে দলে ভেড়ায়। লন্ডনে এসে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন তিনি। প্রিমিয়ার লিগের দ্রুতগতির ফুটবল, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের চাপের মধ্যেও নিজের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে থাকেন।
বিশ্বকাপে আসার আগে খুব কম মানুষই তাকে স্পেনের সম্ভাব্য নায়কদের তালিকায় রেখেছিলেন। আলো ছিল লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি কিংবা ফ্যাবিয়ান রুইজদের ওপর। মেরিনো উত্তর মাঠেই দিয়েছেন।
রাউন্ড অব ১৬-তে শক্তিশালী পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, শেষ মুহূর্তে বক্সে ঢুকে মেরিনোর জয়সূচক গোল স্তব্ধ করে দেয় পুরো স্টেডিয়াম। স্পেন উল্লাসে ভাসে, আর পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্বপ্ন থেমে যায়। সেই গোল শুধু স্পেনকে কোয়ার্টার-ফাইনালে তোলেনি, মেরিনোকে জাতীয় নায়কের আসনেও বসিয়ে দিয়েছিল। সমর্থকেরা নতুন একটি নাম দিয়েছে—মিস্টার লাস্ট মিনিট।
মেরিনো কখনোই ব্যক্তিগত প্রশংসায় ভেসে যাননি। ম্যাচ শেষে তার শান্ত কণ্ঠে উচ্চারিত একটি বাক্য ছিল,ফুটবলে নায়ক একজন নয়। মাঠে নামা প্রতিটি খেলোয়াড়, বেঞ্চে বসা প্রতিটি সতীর্থ, কোচিং স্টাফরা সটমিলে একটি জয় তৈরি করে। আমি শুধু আমার কাজটা করেছি।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে একবার বলেছিলেন, যেকোনো কোচ মিকেল মেরিনোর মতো একজন ফুটবলারকে নিজের দলে চাইবে। কারণ সে সব সময় দলের প্রয়োজনকে নিজের আগে রাখে।
মাঠের বাইরেও মেরিনো একজন অত্যন্ত সাধারণ মানুষ। পরিবার তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাবা মেরিনো আজও ছেলের প্রতিটি ম্যাচ গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেন। ছোটবেলায় যে বাবা ছেলেকে ফুটবল শেখাতেন, আজ সেই বাবা গ্যালারিতে বসে ছেলের সাফল্যে চোখের জল লুকিয়ে রাখেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাস লেখা হবে, মিকেল মেরিনোর নাম সবচেয়ে বেশি গোলদাতাদের তালিকায় থাকবে না। কেউ কেউ ফুটবল খেলেন ট্রফি জেতার জন্য। কেউ খেলেন নিজের নাম ইতিহাসে লেখার জন্য। মিকেল মেরিনো খেলেন দেশের পতাকাকে আরও একটু উঁচুতে ওড়ানোর জন্য। মেরিনো স্পেনের বিশ্বাস, সাহস আর নীরব হৃদস্পন্দন।
বাংলাদেশ সময়: ০:৫৭:২৮ ১২ বার পঠিত