![]()
শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যার পর ঢাকার অপরাধ জগতের নতুন মেরূকরণ ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। হত্যার কারণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া গেলেও সন্দেহভাজনের তালিকায় চলে এসেছে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম। গণঅভ্যুত্থানের পর জামিনে মুক্ত এই সন্ত্রাসীদের অনেকেই ফিরেছেন স্বরূপে। নিজেদের এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে গিয়ে তারা খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েছেন।
টিটন হত্যার ঘটনায় গতকাল বুধবার তাঁর বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা করেছেন। এজাহারে বলা হয়, বছিলার গরুর হাট ইজারা নিয়ে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী এনামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালসহ কয়েকজনের সঙ্গে টিটনের বিরোধ চলছিল। তবে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, শুধু গরুর হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব, নাকি অন্য কোনো বিরোধে সন্ত্রাসী গ্রুপ তাঁকে টার্গেট করেছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে ছোট ভাইয়ের লাশ বুঝে নেন রিপন। এ সময় বছিলা গরুর হাট নিয়ে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে টিটনের বিরোধের কথা সাংবাদিকদের বলেন তিনি।
রিপন দাবি করেন, হত্যার শিকার হওয়ার কয়েক দিন আগে বছিলার গরুর হাট নিয়ে হেলালের সঙ্গে বিরোধের কথা তাঁকে বলেছিলেন টিটন।
তিনি বলেন, ‘আমারে বলছে, পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বছিলার গরুর হাট নিয়ে ঝামেলা চলতেছে। একটু পরে আবার বলছে, না বড় ভাই, ওরকম কিছু না, ঠিক হয়ে যাবেনে, দোয়া কইরেন।’ টিটনের ভগ্নিপতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। তারা দুজনই একসময় মোহাম্মদপুরের হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর টিটনসহ পুলিশের তালিকায় থাকা আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর টিটন আর আদালতে হাজিরা দেননি।
টিটনের ভাই সাঈদ আক্তার রিপন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি সিঙ্গাপুরে থাকতাম, আর টিটন ঢাকায়। সে পরিবার থেকে একরকম বিচ্ছিন্নই ছিল। ২০২৪ সালে জামিন পাওয়ার পর দুইবার যশোরে গেছে। এর মধ্যে একবার আমার সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য দেখা হয়। আমি জানতাম সে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় থাকত। কিন্তু এ ঘটনার পর জানলাম, সেখানেও থাকত না। কোথায় থাকত তাও জানি না।’
তিনি এজাহারে বলেন, ‘দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর ২০২৪ সালের আগস্টে জামিনে মুক্তি পায় আমার ছোট ভাই টিটন। সে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনের অ্যাপের মাধ্যমে আমার সঙ্গে কথা বলত। সে বলত যে বড় ভাই, আমি আপনার অনেক আর্থিক ক্ষতি করেছি। এখন চেষ্টা করছি যাতে আপনাদের আর কোনো বদনাম না হয়। সে জন্য আমাকে দোয়া করবেন। আমি যেন ভালোভাবে কাজ করে জীবনযাপন করতে পারি।
কিছুদিন আগে আবার অ্যাপের মাধ্যমে জানায়, বড় ভাই আমি একটা শিডিউল (দরপত্র) কিনছি। গত ২৬ এপ্রিল ফোন দিয়ে জানায়, আমার সঙ্গে ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ড্যাগারি রনিদের বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে ঝামেলা চলছে। পরদিন বলে, আমাকে ডাকছে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করার জন্য। এর পর গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে জানতে পারি, নিউমার্কেট এলাকার শাহ্নেওয়াজ হলের সামনে থেকে টিটনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
একই সময়ে জামিনে মুক্ত হওয়া আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সঙ্গে টিটনের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল বলে জানান কেউ কেউ। এ বিষয়ে টিটনের ভাই রিপন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইমনের সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না। এমনিতে ছোটখাটো ঘটনা ভাইবোনের মধ্যে থাকতেই পারে। তবে সেটা কিলিং পর্যায়ের কোনো বিরোধ বলে আমি মনে করি না। কারণ, ইমন আমার মায়েরও যত্ন করত।’
অবশ্য পুলিশ বলছে, আধিপত্য বিস্তারসহ সম্ভাব্য সব কারণ মাথায় রেখেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম বলেন, মামলার বাদী বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে কিছু ঝামেলার কথা বলেছেন। তবে পরে পিচ্চি হেলালের লোকজন ডেকেছিল সমঝোতা করার জন্য। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। আবার স্বজন যে সবটা সত্যিই বলেছেন, তা নাও হতে পারে। এ জন্য প্রথমে শুটারদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাদের পাওয়া গেলে নেপথ্যের লোকজনকেও শনাক্ত করা যাবে। সমস্যা হচ্ছে, সিসিটিভির যে ফুটেজ পাওয়া গেছে, তাতে মোটরসাইকেলে দুজনকে চলে যেতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। আপাতত বিভিন্ন উপায়ে তাদের শনাক্তের চেষ্টার পাশাপাশি সম্ভাব্য সব কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দ্বন্দ্বে টিটন খুনের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডে আবারও অস্থিরতার আভাস দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যায় টিটন জড়িত কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই হত্যার বদলা নিতে টিপুর আরেক ভাই শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদ পিচ্চি হেলালের মাধ্যমে এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন। তবে যে কারণেই হত্যা করা হোক না কেন, এর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরও সংঘাত ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর টিটন, ইমন, হেলাল ছাড়াও আরও ২৪ শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়েছেন। তাদের কেউ বিদেশে, আবার কেউ দেশে বসেই নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাঈফ মামুনকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। সেটিও ছিল আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জের। টিটন হত্যায় সন্দেহের তালিকায় থাকা পিচ্চি হেলাল কারাগারে থেকেও চাঁদাবাজি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জামিনে বেরিয়ে তিনি আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। গত বছরের ১০ জানুয়ারি ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে দুই ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে কোপানো হয়। তদন্তে জানা যায়, সেটিও ছিল হেলালসহ দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধের জের। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদপুরে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলালের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, টিটন হত্যার ঘটনায় একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় সন্দেহজনক অবস্থায় ঘোরাঘুরি করছিলেন তিনি। আরও বিস্তারিত পেলে আটক ব্যক্তি হত্যা পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট– এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারবে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় টিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০০১ সালে সরকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরি ও ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে। সেই তালিকায় ছিলেন টিটন।
বাংলাদেশ সময়: ১৮:০৫:২৫ ৫ বার পঠিত