![]()
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা গণভোট, গুম প্রতিরোধ, দুদক সংস্কারসহ ২০টি অধ্যাদেশ সংসদের চলতি অধিবেশনে অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে না। এর ফলে কার্যকারিতা হারাচ্ছে এসব অধ্যাদেশ। এর মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে এ চার অধ্যাদেশের অধীনে নেওয়া কার্যক্রম হেফাজতের জন্য সংসদে বিল আকারে তোলা হবে। বাকি ১৬টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বুধবার সংসদ অধিবেশনে সংসদীয় বিশেষ কমিটির রিপোর্টে এ সুপারিশ করা হয়। সংসদে রিপোর্ট উত্থাপন করেন বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ পাশ করা এবং বাকি ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি।
এই ১৫টি অধ্যাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আনা অনেক সংশোধনী বাদ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশও রয়েছে।
যদিও বিশেষ কমিটির এই রিপোর্টের সব সুপারিশের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হননি বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতের তিন সদস্য। তারা ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে বিশেষ কমিটিতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। ১৩ সদস্যের এ বিশেষ কমিটির ১০ জনই বিএনপির, বাকি তিনজন জামায়াতের সংসদ-সদস্য।
সংসদে রিপোর্ট উত্থাপনের পর আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রিপোর্ট অনুযায়ী সোমবার থেকে স্ব স্ব মন্ত্রীরা নিজ মন্ত্রণালয়ের অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে পাশের জন্য তুলবেন। ৯ এপ্রিলের মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ কার্যকর করা হচ্ছে, সেগুলোর বিল পাশ করতে হবে।
তারা জানান, ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য শুধু যেসব ধারা-উপধারায় সংশোধন আনা হচ্ছে, সেগুলো তোলা হবে। তখন স্পিকার সংশোধনীর তুলনামূলক বিবরণী উপস্থাপন করতে বলেন। এসব বিল পাশ হবে সংসদের চার অধিবেশনে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশ ৯ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় সেগুলো মূলত কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। আইন অনুযায়ী কোনো অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন করা না হলে তার কার্যকারিতা লোপ পাবে। বিশেষ কমিটির এ সুপারিশের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার প্রশ্নের মুখে পড়ল।
কার্যত অনেক সংস্কার বাদ হতে যাচ্ছে। এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত-এনসিপির দূরত্ব আরও বাড়ল। ইতোমধ্যে ১১ দলীয় জোট শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরুর পর ওইসব অধ্যাদেশ সংসদের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হয়। সংসদ অনুমোদন না করলে ওই অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারায়। কিন্তু ২০টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করায় সেগুলো মূলত লোপ হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশও রয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি ভোট পড়ে। আর ‘না’ ভোটের পক্ষে ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি ভোট পড়ে। বাতিলসহ মোট ভোট পড়ে ৭ কোটি ৬৬ লাখ ২১ হাজার ৪০৭টি। জামায়াত-এনসিপি জোট গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংস্কারের দাবি জানায়।
১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ম অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে (১২ মার্চ) উপস্থাপন করা হয়। পরে এগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। ওই কমিটি ২৪, ২৫ ও ২৯ মার্চ বৈঠক করে এ প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ অসুস্থ থাকায় তিনি বৈঠকে অংশ নেননি। কমিটির আমন্ত্রণে জামায়াতের সংসদ-সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান সভায় উপস্থিত ছিলেন।
চার অধ্যাদেশ বাতিল: চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ এবং হেফাজতের জন্য বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ। সুপ্রিমকোর্ট সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন জামায়াতের তিন সদস্য।
সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বিষয়ে ভিন্নমত দিয়ে জামায়াতে ইসলামী বলেছে, এই অধ্যাদেশটি বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর অধীনে প্রধান বিচারপতিকে প্রশাসনিক প্রধান করে ‘সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়’ নামে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠন করা হয়েছে, যা বিচার বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রদান করে। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত।
সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশের বিষয়ে জামায়াতের নোট অব ডিসেন্টে বলা হয়, বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে এটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হবে। সার্বিকভাবে এই অধ্যাদেশ বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আধুনিক, সুসংগঠিত এবং গ্রহণযোগ্য করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
অনুমোদন পাচ্ছে না ১৬টি অধ্যাদেশ: রিপোর্টে ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে সংসদে না তোলার কথা বলা হয়েছে। এতে মূলত এই অধ্যাদেশগুলো কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১১টিতেই নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতের তিন সদস্য।
এই ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে-গণভোট অধ্যাদেশ; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ; রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ; রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ; দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ; মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ; তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ; মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ; কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ; আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ; বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ।
এর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। ওই অধ্যাদেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এর অনুমোদন না পাওয়ায় গণভোটের ফলাফল আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সংশোধিত আকারে উঠবে ১৫টি অধ্যাদেশ: রিপোর্টে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কোথায় কী সংশোধনী আনা হবে, তা বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে উলেখ করা হয়নি।
এগুলো হলো-২০২৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট), জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধান) অধ্যাদেশ, ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংশোধন করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এই অধ্যাদেশে কোনো নিদিষ্ট সত্তার কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয় এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সত্তার মিছিল, মিটিং, প্রকাশনাসহ যেসব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা যাবে তার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
৯৮টি হুবহু পাশের সুপারিশ: ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাশ করার সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত।
এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কিছু অধ্যাদেশ রয়েছে। যেসব অধ্যাদেশ হুবহু উঠছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও); বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডিন্যান্স ২০২৪; বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ; বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (সংশোধন) অধ্যাদেশ; জাতির পিতার পরিবার সদসদ্যগণের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ; গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ; ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট); জাতীয় সংসদের সীমানা নির্ধারণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ; সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ; সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদপরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ; জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ; জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ।
বাংলাদেশ সময়: ০:০৪:০৯ ৯ বার পঠিত