বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা

প্রথম পাতা » জাতীয় » বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা
মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬



বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা

মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ মানুষের নামে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা।

ভুয়া কাস্টডি ওয়ারেন্ট তৈরি করে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে এনে দেওয়া হচ্ছে ‘বিশেষ সুবিধা’; এমনকি সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে পালিয়ে যাওয়ারও! এছাড়া খোদ আদালতেই চলছে বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতির মহোৎসব।

গণমাধ্যমের কয়েক মাসব্যাপী অনুসন্ধানে কতিপয় পুলিশ ও আইনজীবী এবং আদালত ও কারাগারের অসাধু কর্মচারীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এমনই এক সংঘবদ্ধ চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি প্রথমে বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে আসামিদের নামে ভুয়া কাস্টডি ওয়ারেন্ট তৈরি করে। পরিকল্পিতভাবে নিজেদের সুবিধামতো তারিখ বসিয়ে ওই ভুয়া ওয়ারেন্ট কারাগারে পাঠায়। পরে কারাগারে থাকা চক্রের সহযোগীরা সেটিকে ওয়ারেন্ট তালিকায় এন্ট্রি করে। ফলে নথি অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়।

কিন্তু আদালত কক্ষে হাজির করার পরিবর্তে চক্রের সদস্যরা তাকে আদালত ভবনের অন্যত্র নিয়ে যায়। এরপর সুবিধামতো কোনো কক্ষ বা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসামিকে নানা ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়।

এর মধ্যে রয়েছে আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠক, খাওয়াদাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা-এমনকি গোপনে বৈঠক করার সুযোগও দেওয়া হয়।

এ ধরনের ঘটনার তথ্যপ্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজ গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, আসামিকে আদালতে হাজিরার কথা বলে হাজতখানা থেকে বের করে আদালত ভবনের ১০ তলার রেকর্ড রুমে নিয়ে ওইসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

একই আসামিকে টানা চারদিন একই কৌশলে আদালতে এনে একই কক্ষে নেওয়া হয়েছে। অথচ ওই চার দিনের কোনোদিনই আসামির আদালতে হাজিরার নির্ধারিত তারিখ ছিল না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভুয়া ওয়ারেন্টের ভিত্তিতেই তাকে কারাগার থেকে বের করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে চক্রটি আসামি বা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে। মামলার ধরন, আসামির প্রভাব ও সুবিধার মাত্রা অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা ওয়াসিমের নামে হঠাৎ করেই একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা যায় স্থানীয় থানায়। পরোয়ানায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকার কলাবাগান থানায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তিনি আসামি। বিষয়টি জানতে পেরে ওয়াসিম ঢাকায় এসে আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে খোঁজ নেন আদৌ তার বিরুদ্ধে এমন কোনো মামলা আছে কি না। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার নামে জারি হওয়া পরোয়ানাটি সম্পূর্ণ ভুয়া। শুধু ওয়াসিমই নন, গণমাধ্যমের হাতে এমন আরও ৮টি জাল পরোয়ানার কপি এসছে। সবই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়েছিল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব পরোয়ানা ডাকযোগে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও বোয়ালখালী থানায় পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট থানা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পায়, পরোয়ানাগুলো পুলিশের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ সিডিএমএস-এ অন্তর্ভুক্ত নেই। এ কারণে সেগুলো ডিএমপি বরাবর ফেরত পাঠানো হয় সিডিএমএস-এ এন্ট্রির জন্য। পরে ডিএমপি থেকে পরোয়ানাগুলো আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে পাঠানো হলে সেখানে যথাযথ যাচাই ছাড়াই সেগুলো সিডিএমএস-এ এন্ট্রি করা হয়। এর ফলে জাল পরোয়ানাগুলো সরকারি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে আবার সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়।

এরপরই ওয়াসিম জানতে পারেন, ঢাকার একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তবে ঢাকায় এসে জানতে পারেন এই পরোয়ানা ভুয়া। গণমাধ্যম এসব মামলার কপি যাচাই করে দেখে, মামলার এজাহারে তাদের কারও নাম নেই।

জানা যায়, চক্রটি হুবহু আদালতের আসল পরোয়ানার আদলে জাল গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৌশলে পাঠিয়ে দেয়। ভুয়া ওয়ারেন্টগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেগুলো দেখতে প্রায় অবিকল আসল পরোয়ানার মতো। পরোয়ানায় সংশ্লিষ্ট আদালতের ফরম্যাট, মামলার তথ্য এবং বিচারকের স্বাক্ষরও রয়েছে।

সূত্র জানায়, এত নিখুঁতভাবে আদালতের ফরম্যাট ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করা সাধারণ কারও পক্ষে সম্ভব নয়। যারা আদালতের নথিপত্র, পরোয়ানা ইস্যুর পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি জানেন, তারাই এমন জাল নথি তৈরি করতে পারেন। এ চক্রের সঙ্গে আদালতের কিছু অসাধু পেশকার, উমেদার এবং পুলিশের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা জড়িত। তাদের যোগসাজশেই এসব জাল পরোয়ানা তৈরি এবং বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর ঘটনা ঘটছে।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। এ ধরনের অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে। তিনি বলেন, এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ, তাই জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরা জরুরি, যাতে অন্যরা সতর্ক হয় এবং এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত থাকে। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ পাইনি। যদি এমন কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, সে ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা তা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখব। তদন্তে কারও দায়দায়িত্ব প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১:০৪:৪৫   ২০ বার পঠিত  




জাতীয়’র আরও খবর


সব ধরনের সংস্কার সংবিধানের কাঠামোর ভেতরেই হবে: আইনমন্ত্রী
নজরদারিতে অনেকে, চাঞ্চল্যকর তথ্য দীর্ঘ হচ্ছে কুশীলবদের তালিকা
বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা
এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার মানহানি মামলা
সচিবালয়ে আকস্মিক বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায়: প্রধানমন্ত্রী
পদ্মায় বাসডুবি: পরিচয় মিলেছে নিহত ২৬ জনের
জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি প্রধান বিচারপতির শ্রদ্ধা
দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর বণ্টন, কে কোন দায়িত্বে?
অন্তর্বর্তী সরকারের ১২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত : আইনমন্ত্রী

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ