![]()
পল্লবীর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে পা রেখে আপনি যে কাউকেই জিজ্ঞাসা করুন- আমিনুল হকের বাসা কোথায়? ব্যস, সবাই দেখিয়ে দেবে পল্লবী সেকেন্ড ফেইজের ডি- ব্লকের বাড়িটি। দীর্ঘদিন ধরে যখন তিনি তারকা ফুটবলার হননি, তখন থেকেই আছেন রাজধানী ঢাকার এই বাসাটিতে। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাড়িটি যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। সকাল থেকেই এখানে লেগে থাকে নেতা-কর্মীদের ভীড়। চলে গভীর রাত অব্দি। আমিনুল কাউকেই নিরাশ করেন না।
দিনের শুরু থেকেই বাড়িটির সামনে মানুষের আনাগোনা। কেউ এসেছেন ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে, কেউ রাজনৈতিক কথা বলতে, কেউবা শুধু প্রিয় ফুটবলারের সঙ্গে একবার দেখা করতে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই দৃশ্য প্রায় প্রতিদিনের।
সকাল হতেই দেখা গেল, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একের পর এক মানুষের কথা শুনছেন তিনি। সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনেন, কোথায় কীভাবে সমাধান হতে পারে-সেই পথটুকু দেখিয়ে দেন। মাঠে যেমন গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে দলকে বাঁচাতেন, এখানেও যেন তেমনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা তার। এই মানুষটিকে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা চিনেছে নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। গোলরক্ষক হিসেবে তার প্রতিক্রিয়া, আত্মবিশ্বাস আর নেতৃত্ব ছিল আলাদা।
গোলপোস্টের বদলে এখন মানুষের মাঝেই রয়েছেন। পল্লবীর অলি-গলি থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের প্রতিটি বাড়িতে তার পদচিহ্ন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনিত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী।
এক সময় এই মানুষটিকে দেখা যেত গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে, চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা নিয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে। আজ সেই আমিনুল হক দাঁড়িয়ে আছেন মানুষের ভিড়ে, শুনছেন তাদের কথা, খুঁজছেন সমাধানের পথ। ফুটবল মাঠের অধিনায়ক থেকে রাজনীতির ময়দানে প্রার্থী-পল্লবীর অলিগলিতে তার এই রূপান্তর হঠাৎ করে হয়নি। একদিনের সরেজমিনে দেখা যায়, কীভাবে জনপ্রিয়তা, পরিচিতি আর এলাকার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক তাকে এনে দিয়েছে নতুন এক লড়াইয়ের সামনে।
আমিনুল হক বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৯৯৪ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লিগে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব থেকে তার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেন। পরের বছরগুলোতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাব, আবাহনী লিমিটেড ঢাকা ও শেখ জামালের মতো ক্লাবের জার্সিতে অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন।
দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন জাতীয় দলের মূল ভরসা। অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুন করে চিনিয়েছেন। ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয় কিংবা দক্ষিণ এশীয় গেমসে সোনা-এসব অর্জনের সঙ্গে তার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের গোলরক্ষক হিসেবে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বহু ম্যাচে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন সমর্থকের হৃদয়ে।
কিন্তু আজকের আমিনুল হক আর শুধু ফুটবল মাঠের নায়ক নন। এখন তিনি রাজনীতির মাঠে নেমেছেন ভিন্ন এক লড়াইয়ে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ (পল্লবী–রূপনগর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। ফলে তার প্রতিদিনের সূচি এখন প্রচারণা, পথসভা, গণসংযোগ আর মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে ঠাসা।
দিনের এক পর্যায়ে তাকে দেখা গেল পল্লবীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে বেড়াতে। প্রতিটি গলি, প্রতিটি মোড় যেন তার চেনা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার উঠে আসে তার শৈশব ও বেড়ে ওঠার গল্প। তিনি বলেন, এই জনপদেই তার বড় হওয়া, এখানকার মানুষের সুখ-দুঃখ তার অজানা নয়। তাই প্রতিশ্রুতি নয়, অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলছেন তিনি।
এরই অংশ হিসেবে আজ দুপুরে তিনি এক গণমিছিলের ডাক দেন, যেখানে লক্ষাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করে। এই মিছিলটি ঢাকা-১৬ আসনের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করে। দুপুরের পর থেকেই মানুষের ঢল নামে। লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণে এই গণমিছিল ঢাকা-১৬ আসনের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। এটি ছিল তার প্রচারণার একপ্রকার সমাপ্তি এবং জনমত জানানোর শেষ বড় প্রয়াস।
গণসংযোগকালে আমিনুল হক বারবার জোর দেন ভোটাধিকার প্রয়োগের ওপর। তিনি বলেন, এই আসনে নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। সবাই যেন নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন-এটাই তার আহ্বান, ‘একটি ভোটই পারে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিতে।’
আমিনুলের ডাকে মিছিলে আসা তরুণ ভোটার রুবেল হোসেন বলছিলেন, ‘দেখুন, আমিনুল ভাই আমাদের মানুষ। এই এলাকাতেই সুখে-দুঃখে আমাদের পাশে আছেন। শুরুতে আমরা গোলকিপার আমিনুলের ভক্ত। আর এখন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও উনাকে চাইছি।’
আমিনুল নিজেও ভাবেন তরুণদের নিয়ে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে আগামীর নেতৃত্ব তরুণদের হাতেই। শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমি কাজ করে যাচ্ছি, লড়ে যাচ্ছি।’
এই দিনের নানা আলোচনায় রাজনৈতিক অভিযোগও এসেছে। আমিনুল হক দাবি করেন, ‘জামায়াতের (প্রার্থী মো. আবদুল বাতেন) জনসমর্থন নেই। তারা সাধারণ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে ভোট নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং রিটার্নিং কর্মকর্তাকেও জানানো হবে।’
দীর্ঘদিনের প্রচারণায় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়ার কথা উল্লেখ করে আজ গণমিছিল শুরুর আগে আমিনুল হক বলেন, ‘আমি পল্লবী ও রূপনগরের প্রতিটি পাড়া-মহল্লার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেছি। ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ মানুষের ভোটে জয়ী হলে আমি প্রতিটি পরিকল্পনা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব, ইনশাআল্লাহ।’
এভাবেই এখন প্রতিটা দিন কাটে ব্যস্ততায়। দিন ফুরিয়ে গভীর রাতে সেই পরিচিত ডি-ব্লকের বাড়িটিতে ফেরেন আমিনুল। চোখে-মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট হলেও মানুষের সঙ্গে কথা বলা থামান না তিনি। ফুটবল মাঠে যেমন ৯০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, রাজনীতির মাঠে যেন সময়ের কোনো সীমা নেই।
আমিনুল হক আগেও লড়াই করেছেন এখনও লড়াইয়ে আছেন। তবে এটি গোল বাঁচানোর লড়াই নয়, এবার মানুষের প্রত্যাশা আর ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। পল্লবীর এই অলি-গলি থেকেই সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাংলাদেশ ফুটবলের এই কিংবদন্তি তারকা!
বাংলাদেশ সময়: ৬:৩১:১২ ৪০ বার পঠিত