মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বৈষম্যবিরোধী মামলা বাণিজ্য চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার

প্রথম পাতা » অন্তবর্তী সরকার » বৈষম্যবিরোধী মামলা বাণিজ্য চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬



চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার

হবিগঞ্জের মাধবপুরের বাসিন্দা মর্তুজা আলী দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ। তার বেশির ভাগ সময় কাটে বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে তিনি ঢাকাতেই ছিলেন না। অথচ রাজধানীর পল্টন থানায় করা একটি মামলায় তিনি অন্যতম আসামি। এজাহারে নাম আছে তার দুই ছেলেরও।

শুধু মর্তুজা আলীই নন, রক্তাক্ত জুলাই অভ্যুত্থানকে পুঁজি করে দেওয়া মামলায় এমন হাজারো ব্যক্তির নাম আছে আসামির তালিকায়। কোনো অপরাধ না করেও ভুক্তভোগী অনেকেরই দিন কাটে আদালতের বারান্দা আর আইনজীবীর চেম্বারে ঘুরে। সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও আইনের জটিল মারপ্যাঁচ থেকে কোনোভাবেই মুক্তি মিলছে না তাদের।

তবে বিলম্বে হলেও বৈষম্যবিরোধী মামলা বাণিজ্যের নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্তের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত মামলার হালনাগাদ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে চার শতাধিক মামলার তালিকা করা হয়েছে। বর্তমানে এসব মামলার এজাহার ও আসামির তালিকা সবিস্তারে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই অভুত্থানের পর অসৎ উদ্দেশ্যে আদালতে মামলার হিড়িক পড়ে। এ সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু আইনজীবী মামলা বাণিজ্যের দোকান খুলে বসেন। রীতিমতো কোমর বেঁধে নামে আদালত ঘিরে সক্রিয় দালাল চক্র। এছাড়া পরিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের সূত্র ধরেও পরিকল্পিতভাবে আসামির ঘরে নিরপরাধ অনেকের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

তালিকা : সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে ৩৮৪টি মামলার তালিকা হয়েছে। এসব মামলার বেশির ভাগই আদালতে করা সিআর (কমপ্লেইন রেজিস্টার্ড) মামলা। পুলিশের তালিকায় এসব মামলার নম্বর, থানার নাম, তারিখ, সংশ্লিষ্ট আদালত ও ফাইলিং আইনজীবীর নাম, সনদ এবং তার মোবাইল নম্বর উল্লেখ করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বেশির ভাগ মামলার নেপথ্যে এক শ্রেণির অসাধু আইনজীবীর কারসাজি রয়েছে। এছাড়া মামলা বাণিজ্যের পেছনে আদালত চত্বর ঘিরে সক্রিয় দালাল চক্র এবং কতিপয় রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। মূলত এদের কারণেই বৈষম্যবিরোধী মামলা ঘিরে এক ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যা পুরো বিচার প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

কেস স্টাডি : হাসিনা সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী মামলা বাণিজ্যের অন্যতম শিকার হন বেসরকারি নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক শেখ মাহবুব রহমান। ১৮ মে পূর্বাচল তিনশ ফিট সড়কে ঘুরতে বেরিয়ে তিনি দুর্বৃত্তদের হাতে পড়েন। সেখানে তার গাড়ি আটকে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। কিন্তু টাকা দিতে রাজি না হলে তাকে কাফরুল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে নেওয়া হয় শাহবাগ থানায়। সেখানেই নানা দেনদরবার শেষে মধ্যরাতে তাকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। প্রায় ৪ মাস কারাবন্দি থেকে ১১ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

মামলা ও গ্রেফতার প্রসঙ্গে মাহবুব রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বন্দ্ব ছিল। সরকার পতনের পর এটি প্রকট আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় দখলের জন্য বৈষম্যবিরোধী মামলায় তাকে আসামি করা হয়। অথচ বাস্তবে জুলাই আন্দোলন চলাকালে তিনিও রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। এ সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন। গোষ্ঠীস্বার্থে মামলাবাজ একটি অসাধু চক্র তাকে কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

ধাপে ধাপে বাণিজ্য : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে অসৎ উদ্দেশ্যে হওয়া কিছু মামলায় কয়েক ধাপে বাণিজ্য হয়। এক্ষেত্রে প্রথম ধাপে খসড়া এজাহার তৈরি করে ভুক্তভোগীদের কাছে পাঠানো হয়। টাকা না দিলে মামলায় নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে চাহিদা অনুযায়ী টাকা পেলে এজাহার থেকে নাম বাদ পড়ে।

সূত্র বলছে, এখানেই শেষ নয়। এজাহারের পরও বাণিজ্যের পথ খোলা থাকে। এ পর্যায়ে চলে হলফনামা দিয়ে নাম বাদ দেওয়ার বাণিজ্য। এক্ষেত্রে মামলার বাদী আদালতে হাজির হয়ে বলেন, তিনি আসামিকে চেনেন না। মামলার আসামি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। বৈষম্যবিরোধী বহু মামলায় এমন হলফনামা আদালতে অহরহ জমা পড়ছে। এছাড়া জামিন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে কতিপয় অসাধু আইজীবীর অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

আদালতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি পুলিশের অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদনের নামেও বাণিজ্য শুরু হয়েছে। নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে ১০ জুলাই এ অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের (ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(ক) ধারা) রেওয়াজ চালু করা হয়। কিন্তু এতে উলটো ফল হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত আওয়ামী দোসরদের অনেককেই নিরপরাধ সাজিয়ে প্রতিবেদন দিচ্ছে পুলিশ। এক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, জুলাই পরবর্তী সময়ে করা কোনো মামলায় যদি ভুয়া আসামি অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব মূলত তদন্ত সংস্থা ও আদালতের। এক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী তদন্ত করে অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন নিরপরাধ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ সময়: ৮:৫১:০৩   ৮৫ বার পঠিত