
ভারতীয় আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তাই কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক আদালত-এসআইএসিতে আদানির বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ওই আদালতে কয়লার দাম নিয়ে অক্টোবরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে আদানি।
জানা গেছে, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান আব্দুল্লাহ সিদ্দিক এবং বিশেষজ্ঞ হিসাবে ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির ইইই বিভাগের অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. এম রেজওয়ান খানকে ওই নালিশি মামলার জন্য নির্বাচিত করে একটি প্যানেল করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবিকে একটি অনুমতিপত্র পাঠানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক এম রেজওয়ান খান বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, এ সংক্রান্ত কোনো চিঠি এখনো পাইনি। চিঠি না পেলে তো কোনো মন্তব্য করা যাবে না।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি তদন্তে গঠিত জাতীয় কমিটির সদস্য মোস্তাক আহমেদ খান বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, আদানির সঙ্গে পিডিবির চুক্তিতে বেশ অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ আছে। তাই ওই সালিশি মামলায় যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ আইনজীবীকে রাখা দরকার। কারণ ওই আইনজীবীদের আদানির মতো কোম্পানির দুনিয়াব্যাপী দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করার দক্ষতা আছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে কয়লাভিত্তিক ১৬০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ এনে পিডিবির কাছে বিক্রি করে আদানি গ্রুপ। দেশটির কয়লাভিত্তিক অন্যান্য কেন্দ্র থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ আমদানি করে প্রতি ইউনিট গড়ে ৮ দশমিক ৫০ টাকায়। সেখানে আদানি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে বিক্রি করছে ১৪ দশমিক ৮৭ টাকায়।
জাতীয় কমিটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের শীর্ষ কয়েকজন আমলা এবং পিডিবির কিছু কর্মকর্তা আদানির চুক্তির সময় বিদেশের অ্যাকাউন্টে টাকা লেনদেন করেছেন। তার প্রমাণ দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক এবং জাতীয় কমিটির কাছে আছে। জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে আদানির মতো ধ্বংসাত্মক এবং দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি আর হয়নি। ওই চুক্তি (পিপিআর) অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিক্রির সবকিছুর নিষ্পত্তি হবে আন্তর্জাতিক আদালতে। সেই অনুযায়ী ঝাড়খণ্ড বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার দাম নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে অক্টোবরে এসআইএসিতে সালিশি মামলা করে আদানি গ্রুপ।
আদানির অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী কয়লার দাম দিচ্ছে না পিডিবি। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি-পিপিআর অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কয়লা বিক্রির ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশ ঝাড়খণ্ডে ব্যবহার হওয়া কয়লার দাম পরিশোধ করবে। পিডিবির অভিযোগ, এখানে আদানি কারসাজি করছে। তাই আদানির কয়লার বিলের পুরোটা পরিশোধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এভাবে মাত্র ৩ বছরে কয়লার দাম নিয়ে ৫০ কোটি ডলার বা ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থের বিরোধ দেখা দিয়েছে আদানি ও পিডিবির মধ্যে। আদানি এই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সিঙ্গাপুরের আদালতের মাধ্যমে জন বিশপ নামে একজন বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দিয়েছে। ওই বিশেষজ্ঞ পিডিবির প্রতিনিধি পাঠাতে নিয়মিত চিঠি এবং ইমেইল দিচ্ছেন সরকারকে। আদানির সালিশের পর গত ৩ মাসে সরকার কোনো সাড়া দেয়নি। এখন ওই সালিশে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্যানেল গঠন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করে আদানির চুক্তিতে কয়লার দামসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, আদানির চুক্তির সময় ঘুস লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। অন্যান্য কেন্দ্রের কয়লার দামের ইনডেক্স এক রকম এবং আদানির ক্ষেত্রে অন্য রকম করে বেশি টাকা আদায়ের কিছু প্রমাণ সরকারের হাতে এসেছে।
বাংলাদেশ সময়: ২২:০৬:১৭ ৩৭ বার পঠিত