বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দ্য ইন্টারপ্রিটারের নিবন্ধ ভারত ক্রিকেটকে আঞ্চলিক আধিপত্যের এক ভোঁতা অস্ত্রে পরিণত করেছে

প্রথম পাতা » খেলা » দ্য ইন্টারপ্রিটারের নিবন্ধ ভারত ক্রিকেটকে আঞ্চলিক আধিপত্যের এক ভোঁতা অস্ত্রে পরিণত করেছে
মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬



ভারত ক্রিকেটকে আঞ্চলিক আধিপত্যের এক ভোঁতা অস্ত্রে পরিণত করেছে

দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি প্রধান কূটনৈতিক যোগাযোগমাধ্যম। দশকের পর দশক ধরে এই খেলাটি উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে কাজ করেছে, যখন আনুষ্ঠানিক কূটনীতি থমকে গেছে তখনও দেশগুলোকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে এই ক্রিকেট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ক্রিকেটকে সফট পাওয়ারের হাতিয়ার থেকে আঞ্চলিক আধিপত্যের এক ভোঁতা অস্ত্রে পরিণত করেছে।

‘ক্রিকেট জবরদস্তি’র এই কৌশল যদি কেবল ইসলামাবাদের ক্ষেত্রে সীমিত থাকত, পাকিস্তানের ঐতিহাসিক বৈরিতার প্রেক্ষাপটে তা হয়তো বোঝা যেত; কিন্তু একই শাস্তিমূলক নীতি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা, বিশেষ করে ভারতের অস্থির প্রতিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে, সবচেয়ে ভালোভাবে বললে অদূরদর্শী, আর খারাপভাবে বললে মারাত্মক ভুল।

গত মাসে দুই দেশের রাষ্ট্রদূত তলব, নয়াদিল্লি ও ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনে সহিংস হামলাসহ এক মাসব্যাপী দ্রুত কূটনৈতিক অবনতির পর ভারত ক্রিকেটকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে নতুন চুক্তিবদ্ধ বাংলাদেশি খেলোয়াড় পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেয়। এটি কোনো ক্রীড়া বিষয়ক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক উদ্বেগ থেকেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়।

ঢাকার পাল্টা জবাব আসে দ্রুতই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানায় যে, তাদের আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় নেয়া হোক। যা কার্যত এক ধরনের ক্রীড়া বয়কটের সূচনা। বাংলাদেশ সরকার আরও এক ধাপ এগিয়ে দেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) শুরুতে বিসিবির ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধে দ্বিধা প্রকাশ করলে ভারতে প্রচলিত মত ছিল- বাংলাদেশের এই প্রতিরোধ কেবল নিজেদেরই ক্ষতি করবে। কারণ বিসিবি বিসিসিআইয়ের আর্থিক শক্তির বিরুদ্ধে অসম লড়াই করছে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের ক্রিকেট আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এক্ষেত্রে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। এতে এমন এক প্রতিবেশী দেশকে চূড়ান্তভাবে দূরে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লির কৌশলগত বলয় থেকে সরে যাচ্ছে।

এই ঘটনাগুলো একটি বিপজ্জনক প্রবণতার প্রতিফলন- ভারতের সফট পাওয়ারের হাতিয়ার বানানো। ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিসিসিআইকে পররাষ্ট্রনীতির প্রদর্শনীতে ব্যবহারের সফল ইতিহাস রয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ক্রিকেটীয় বিচ্ছিন্নতার কৌশল কার্যকর হয়েছিল। কারণ ইসলামাবাদ আগে থেকেই প্রতিপক্ষ ছিল। কিন্তু ঢাকাকে একই চোখে দেখা, যা ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, তা গভীরভাবে সমস্যার।

ভারত যখন প্রথম এই বিচ্ছিন্নতামূলক ক্রিকেট নীতি গ্রহণ করেছিল, তখনকার আঞ্চলিক জোট কাঠামো আজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বাংলাদেশ কোনো একঘরে রাষ্ট্র নয়, যাকে বশে আনা যাবে; বরং এটি এক দৃঢ় স্বাধীন মধ্যশক্তি, জটিল রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মাঠে ঢাকাকে অপমান করে নয়াদিল্লি আনুগত্য তৈরি করছে না, বরং বিচ্ছিন্নতাকেই ত্বরান্বিত করছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। ভারতের জবরদস্তিমূলক নীতি এমন শূন্যতা সৃষ্টি করছে, যা পূরণে অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো প্রস্তুত।

বছরের পর বছর নয়াদিল্লি সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ও ভৌগোলিক নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে বেইজিংয়ের আর্থিক প্রভাব মোকাবিলা করেছে। এখন ভারত যদি স্বেচ্ছায় বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, বিশেষত ক্রিকেটে, সেই সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে চীন সহজেই বাংলাদেশের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত হবে। এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো পাকিস্তানের জন্য তৈরি হওয়া সুযোগ। ভারত দ্বারা নিপীড়িত মনে করা বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই ইসলামাবাদের প্রস্তাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা আর দূরের বিষয় নয়, এটি এখন নয়াদিল্লির বড় পররাষ্ট্রনীতি উদ্বেগ।

কূটনৈতিক সৌজন্য থেকে কঠোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকে এই ঝোঁক ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। এ মাসের শুরুতে এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের ইসলামাবাদ সফরের পর খবর মিলেছে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চালাচ্ছে। ক্রিকেটকে জবরদস্তির হাতিয়ার বানিয়ে ভারত অজান্তেই সেই অক্ষকেই শক্তিশালী করছে, যাকে ভাঙতে সে দশকের পর দশক চেষ্টা করেছে।

এই কূটনৈতিক ফাটলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এটি ভারতের নিজস্ব উচ্চপর্যায়ের কৌশলের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। বিসিসিআইয়ের পদক্ষেপের কয়েক সপ্তাহ আগেই নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্থিতিশীল করার ইঙ্গিত দিয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ডিসেম্বর মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরকে ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সদিচ্ছা হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু বিসিসিআইয়ের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত সেই উদ্যোগকে কার্যত ভেস্তে দিয়েছে। সংবাদচক্রে মোস্তাফিজুর রহমানের মতো জাতীয় ক্রীড়া আইকনের প্রতি অপমান মন্ত্রীর সফরের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিধ্বনিত হয়। এতে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও ওঠে- ভারতের পররাষ্ট্রনীতি আসলে কে চালাচ্ছে? মনে হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তাবাদ ক্রমেই কৌশলগত যুক্তিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশে ‘ভারতবিরোধী মনোভাবের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান দেখিয়ে ঘরোয়া সমর্থন আদায়ের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিসিসিআইয়ের নির্দেশনা ঢাকার আচরণ বদলানোর চেয়ে ভারতের ভেতরের রাজনৈতিক বয়ানকে সন্তুষ্ট করতেই বেশি লক্ষ্যভিত্তিক মনে হয়।

সম্পর্ক রক্ষা করতে হলে নয়াদিল্লিকে দ্রুত অভ্যন্তরীণ তোষণনীতিকে আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে আলাদা করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট বরাবরই কূটনীতির ধারালো অগ্রভাগ ছিল। কিন্তু এটি ক্ষত সারানোর জন্য, নতুন ক্ষত তৈরির জন্য নয়। ভারত বাংলাদেশের মতো কৌশলগত নোঙর হারানোর সামর্থ্য রাখে না। এমন পথ বেছে নিলে নিজের আঙিনাতেই সে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। চারপাশে মিত্র নয়, জমা হবে ক্ষোভের বৃত্ত।

(অনলাইন দ্য ইন্টারপ্রিটার থেকে অনুবাদ)

বাংলাদেশ সময়: ২:২৭:১৪   ৬৪ বার পঠিত