কারাগারে যান হেঁটে, ফেরেন হুইলচেয়ারে

প্রথম পাতা » জাতীয় » কারাগারে যান হেঁটে, ফেরেন হুইলচেয়ারে
শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬



কারাগারে যান হেঁটে, ফেরেন হুইলচেয়ারে

সময়টা ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারে হেঁটেই ঢুকেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। পায়ের শক্তি তখনো ছিল, মুখে ছিল দৃঢ়তার ছাপ। সেদিন তিনি কারাগারে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নয়, বরং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার, হয়রানিমূলক মামলায় অভিযুক্ত হিসাবে ঢুকেছিলেন। নেতাকর্মীদের কাছে সেই দিনটি শুধু কারাবাসের নয়, দিনটি ছিল দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেত্রী খালেদা জিয়ার গণতন্ত্রের পক্ষে আপসহীনতার প্রতীক হিসাবে। পরবর্তী সময়ে শরীরে নানা অসুখ নিয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরেছিলেন হুইলচেয়ারে।

জানা যায়, দীর্ঘ চার দশক রাজনীতিতে অন্তত পাঁচবার তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনবার, ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে একবার এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালে একবার। তবে ২০১৮ সালের কারাগারে যাওয়া ছিল ভিন্ন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে দণ্ডিত করে শেখ হাসিনার সরকার জনসম্মুখে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নিদর্শন দেখায়। বিএনপির সব সময় অভিযোগ করে আসছিল-মামলাগুলো ছিল হয়রানিমূলক, রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত, যার লক্ষ্য ছিল খালেদা জিয়াকে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করা।

কারাগারে পাঠানোর পর প্রথমে খালেদা জিয়াকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কারাগারে রাখা হয়েছিল। পরে অসুস্থতার কারণে স্থানান্তর করা হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। তবে সেখানে তার চিকিৎসা স্বাধীনতার কোনো ছায়া ছিল না। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার যে চিকিৎসা প্রয়োজন, তা শেখ হাসিনা সরকারের প্রতিহিংসার কারণে তাকে দেওয়া হয়নি। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগও বারবার আটকে দেওয়া হয়।

যার ফলে কারাবাসের প্রতিটি দিন ক্রমেই দুর্ভোগের গল্প হয়ে উঠে খালেদা জিয়ার জন্য। কারাগারে থাকাকালীন তার স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করে। ক্লান্তি, শারীরিক ব্যথা, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, হার্টের সমস্যা, লিভারসিরোসিস, চোখের সমস্যা, কিডনি সমস্যাসহ নানা জটিলতায় শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় যিনি আদালত চত্বরে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলতেন, সেই মানুষটি হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ কোভিড পরিস্থিতিতে সরকার নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার দণ্ড সাময়িক স্থগিত করে। তবে সেটি ছিল শর্তসাপেক্ষে। পূর্ণ মুক্তি নয়, বিদেশে চিকিৎসার অনুমতিও নয়। বাসাটিই পরিণত করা হয় সাব-জেলে।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে ৬ আগস্ট খালেদা জিয়ার দণ্ড মওকুফ করা হয়। বহুলপ্রতীক্ষার পর মুক্তির স্বাদ মিললেও তার শরীর তখন আগের অবস্থায় নেই। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি তাকে লন্ডনে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। কিছুটা উন্নতি হলেও দীর্ঘদিনের অন্যায় কারাবাস, জুলুম-নির্যাতন এবং দেরিতে পাওয়া চিকিৎসার ক্ষত তার শরীরে গভীরভাবে রয়ে যায়। প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন। হাসপাতালে ভর্তিও করানো হতো। ২৩ নভেম্বর সর্বশেষ অবস্থা খারাপ হলে তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে দীর্ঘ এক মাসের বেশি চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত তার শরীর আর চিকিৎসার আহবানে সাড়া দিতে পারল না। নীরবে, পরম সত্যকে গ্রহণ করে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় দেশনেত্রী খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন তার প্রিয় দেশবাসীর কাছ থেকে।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, একজন সুস্থ মানুষ হেঁটে হেঁটে কারাগারে প্রবেশ করলেও আড়াই বছর পর তাকে হুইলচেয়ারে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ১৫ থেকে ১৬ বছর ধারাবাহিক নির্যাতন ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ হয়নি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত ও অমানবিক পরিবেশের কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। এ সময় তার জন্য যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। এমনকি তার খাবারে স্লো পয়জন (বিষ) প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ।

বাংলাদেশ সময়: ২৩:৫৭:০৭   ৯৯ বার পঠিত  




জাতীয়’র আরও খবর


রমনা বটমূলে বোমা হামলা ২৫ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক আইনে করা মামলার বিচার
নতুনের আবাহনে পহেলা বৈশাখের আগমন
মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্যের পদত্যাগ খোলা চিঠি
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল নতুন আইন না হলে চাপ আরও বাড়বে
সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী ১৬টি অধ্যাদেশ নিয়ে কোনো অস্বচ্ছতা নেই
দুপুরে জামিনের পর বিকেলেই কারামুক্ত শিরীন শারমিন
‘দিস ইজ নট শাহবাগ স্কয়ার, মিস্টার আবদুল্লাহ’, হাসনাতকে স্পিকার
‘আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো মানিকের জন্ম হোক, খায়রুল গজিয়ে উঠুক’
৪২ দিনে দেশে কোনো গুম-ক্রসফায়ার হয়নি: আইনমন্ত্রী
শেখ হাসিনা, কামালসহ হাদি হত্যার আসামিদের ফেরত চাইল বাংলাদেশ

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ