
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রুদের একটি অংশের বিরুদ্ধে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদেশে দায়িত্ব পালনের সময় পাওয়া ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্স একসঙ্গে উত্তোলন করে হুন্ডি চক্রের মাধ্যমে নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠানো হতো।
এ কাজে কেবিন ক্রু ইউনিয়নের কয়েকজন নেতারও সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে চক্রটির অন্যতম মূলহোতা হিসেবে ফ্লাইট স্টুয়ার্ড আব্দুস শাকুর মুজাহিদের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৪ মে জনতা ব্যাংকের দুবাই শাখা থেকে ১৯৬ জন কেবিন ক্রুর ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্স বিলের বিপরীতে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার দিরহাম একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। চেকটি ইস্যু করা হয়েছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্টুয়ার্ড আব্দুস শাকুর মুজাহিদের নামে।
পরদিন বাংলাদেশ বিমানের ‘বিজি-২৪৮’ ফ্লাইটে দুবাই থেকে ঢাকায় ফেরেন আব্দুস শাকুর মুজাহিদসহ সংশ্লিষ্ট কেবিন ক্রুরা। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে তাদের লাগেজ তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২৬ লাখ টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। তবে উত্তোলিত প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার দিরহামের মধ্যে অবশিষ্ট প্রায় সাড়ে ১২ লাখ দিরহামের কোনো হিসাব মেলেনি।
গণমাধ্যমের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের বাকি অংশ একটি হুন্ডি চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে দেশে থাকা ওই চক্রের একজন এজেন্ট সংশ্লিষ্ট কেবিন ক্রুদের কাছে সমপরিমাণ অর্থ পৌঁছে দেন। অনুসন্ধানে চক্রটির অন্যতম মূলহোতা হিসেবে আব্দুস শাকুর মুজাহিদের নাম উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে বিমান কেবিন ক্রু ইউনিয়নের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফ্লাইট স্টুয়ার্ড আব্দুস শাকুর মুজাহিদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি তো এখন ট্রেনিং সেন্টারে আছি। আমার ট্রেনিং চলছে।’
তবে এ ধরনের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২২ এপ্রিল ১৬০ জন কেবিন ক্রুর ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্সের বিল ফ্লাইট স্টুয়ার্ড ইফতেখার আলমের নামে ইস্যু করা হয়েছিল। প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার দিরহামের ওই বিলশিট প্রস্তুত করা হয় বাংলাদেশ বিমান কেবিন ক্রু ইউনিয়নের নামে।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়নের কয়েকজন নেতার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে বহু কেবিন ক্রুর ভাতা একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। পরে হুন্ডির মাধ্যমে সেই অর্থ দেশে এনে ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ বিমান কেবিন ক্রু ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে লিখিত বক্তব্যে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
অনুসন্ধানে ১৪ মে’র ঘটনার সঙ্গে বিমানের তৎকালীন চিফ ফাইন্যান্স অফিসার মিজানুর রশীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৬টি চেকের মাধ্যমে ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্স উত্তোলনের অনুমোদন দিয়েছিলেন তিনি। পরে ১৯ মে পৃথক একটি অনিয়মের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
এদিকে, হুন্ডি চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বিমানের দুবাই স্টেশনের অর্থ ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও।
এ ধরনের অনিয়ম দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুতর হুমকি বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দ্রুত এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অন্যরাও হুন্ডির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে উৎসাহিত হতে পারেন। এতে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের আর্থিক খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ‘এ ধরনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত আছে এবং তাদের যদি সঠিক বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় না আনা যায় অথবা তাদের এই কর্মকাণ্ড যদি বন্ধ করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে আরও অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হতে পারে। কারণ আগে বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে পার পেয়ে গিয়েছেন।’
ইতোমধ্যে কেবিন ক্রুদের ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্স নিয়ে হুন্ডির অভিযোগ তদন্তে মাঠে নেমেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এ বিষয়ে বিমানের জিএম (পিআর) বোসরা ইসলাম বলেন, ‘আমাদেরকে তদন্ত করতে বলেছে। এটি এখন প্রক্রিয়াধীন আছে। তদন্ত হবে।’
সাড়ে চার কোটি টাকা ও সোয়া তিন কোটি টাকার দুটি চেক নতুন করে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেবিন ক্রুদের ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্স ব্যবস্থাপনাতেই অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ। প্রশ্ন উঠেছে, কতদিন ধরে চলছিল এই কার্যক্রম, কারা জড়িত এই চক্রে এবং কত অর্থের হিসাব এখনো অজানা।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:২৪:১১ ১৬ বার পঠিত