![]()
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, হাইপ (শোরগোল) তৈরি করে গুমের বিচারের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বুধবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে আগের দিনের শুনানির সময় আইনজীবীদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি।
তাজুল ইসলাম বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবী ডিসেন্সি (শিষ্টাচার) রক্ষা করেননি। উলটো গণমাধ্যমের সামনে অভিযোগ করেছেন, তিনি সিনিয়র আইনজীবী। তাকে মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এটা হচ্ছে এক ধরনের হাইপ তৈরি করে এ বিচারের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা চালানো।
আসামিরা বারবার তাদের পরিচয় ভুলে গিয়ে বারবার বলার চেষ্টা করছেন, আমরা সেনাবাহিনীর অফিসার। অথচ সেনাবাহিনীর বিচার এখানে হচ্ছে না। তারা যখন অপরাধগুলো করেছেন তারা কখনো সেনা কমান্ডের অধীনে ছিলেন না। সেনাবাহিনীর পোশাকে ছিলেন না। শৃঙ্খলার মধ্যে ছিলেন না। তারা অপরাধটা করেছেন র ্যাব-পুলিশ পরিচয়ে। আমরা সেনাবাহিনীর বিচার করছি না। অথচ এই সেনা পরিচয়কে বাইরে ব্যবহার করার মাধ্যমে তারা এ মামলাটাকে সেন্সেটাইজ করার চেষ্টা করেছেন। এটা অসৎ উদ্দেশ্যে করছেন আসামিপক্ষের এই আইনজীবীরা। এখানে অপরাধী যেই হোক, তিনি কোন পোশাকে আছেন, কোন র ্যাংক (পদ) বহন করেন তা দেখা হবে না। তিনি প্রধানমন্ত্রী না যে কোনো বাহিনীর প্রধান হন বা সিভিলিয়ান হন-আইন সবার জন্য সমান।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশের পর সূচনা বক্তব্যের তারিখ ঘিরে বাদানুবাদের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন আদালত।
এদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০ জানুয়ারি রায় ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই ট্রাইব্যুনালে রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ২০ জানুয়ারি এ মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
চিফ প্রসিকিউটর ব্রিফিংয়ে বলেন, আমরা বারবার বলার চেষ্টা করেছি আদালতের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। কিন্তু আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি (ক্লেইম) করার চেষ্টা করেছিলেন যে, তিনি একজন সিনিয়র আইনজীবী। অথচ আমরা রেকর্ড ঘেঁটে দেখলাম তিনি ২০২৫ সালে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হয়েছেন। অথচ দাবি করছেন তিনি একজন সিনিয়র আইনজীবী। তাকে রেসপেক্ট (সম্মান) করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার-১৯৭২-এ বলা আছে, যেটার মাধ্যমে আইনজীবীদের শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয়। সেখানে আর্টিকেল ২৬-এ খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, চিফ প্রসিকিউটর অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ ধারণ করেন। তাকে সেই পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল যখন কোনো আদালতে শুনানির জন্য দাঁড়াবেন, তখন কোনো আইনজীবী আর দাঁড়াতে পারবেন না। অর্থাৎ আমি যখন কোর্টে যুক্তিতর্কের জন্য দাঁড়াব, সেখানে অন্য পক্ষের যত আইনজীবী থাকুন-সিনিয়র বা জুনিয়র হোক; আমি দাঁড়ানো থাকা অবস্থায় কোনো আইনজীবী কথা বলতে পারবেন না। এটাই হচ্ছে আইন। আমি বসে গেলে তখন তারা তাদের আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্ক করতে পারবেন। কিন্তু তারা সেই ডিসেন্সিটা (শিষ্টাচার) রক্ষা করেননি। উলটো গণমাধ্যমের সামনে অভিযোগ করেছেন, তিনি সিনিয়র আইনজীবী। তাকে মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এটা বিচারের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা।
তাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে হাজারও মানুষকে গুম করা হয়েছে। তাদের মধ্যে শত শত মানুষকে গুমপূর্বক হত্যা করে লাশ বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল, সাগরে, জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এমন কঠিন মামলার বিচার যখন হচ্ছে।
চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডের রায় ২০ জানুয়ারি : জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০ জানুয়ারি রায় দেওয়া হবে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বুধবার রায়ের এই তারিখ ধার্য করেন। এ মামলায় আসামি আটজন। তাদের মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল পলাতক। আসামিদের মধ্যে গ্রেফতার আছেন শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেন, সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলাম। এ মামলার আসামি ইমাজ হোসেনের আইনজীবী মো. জিয়াউর রশিদ এবং পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী কুতুব উদ্দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এর মধ্য দিয়ে এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায়ের তারিখ ধার্য করেন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় গত বছরের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন : জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ২০ জানুয়ারি এ মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বুধবার এ আদেশ দেন। এ মামলার চার আসামির মধ্যে দুজন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম। তাদের বুধবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অপর দুই আসামি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান পলাতক। ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেন, এ মামলা থেকে এই আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার কোনো মেরিট নেই। আসামিপক্ষের অব্যাহতির আবেদন বাতিল করা হলো। আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হলো। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর আসামিদের বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল। এরপর উপস্থিত আসামিদের কাছে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তারা স্বীকার করেন কিনা। জবাবে আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম বলেন, তারা নির্দোষ। ট্রাইব্যুনালের কাছে তারা ন্যায়বিচার আশা করছেন।
যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যা মামলায় হাবিবুরসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ জমা : জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এ অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অন্য আসামিরা হলেন-ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, মো. মাসুদুর রহমান মনির, নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান, জাকির হোসাইন, মো. ওহিদুল হক মামুন, সাজ্জাদ উজ জামান ও মো. শাহদাত আলী। বাকিরাও পুলিশে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন ২০২৪ সালের ২০ জুলাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তাইম। তার বাবা মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়াও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপপরিদর্শক। ওই দিন বন্ধুর সঙ্গে চা পান করতে বেরিয়ে যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিতে লাশ হয়ে ফিরতে হয় তাকে। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ছেলের লাশ পেয়ে ফোনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ময়নাল বলেন, স্যার, আমার ছেলেটা মারা গেছে। বুলেটে ওর বুক ঝাঁজরা হয়ে গেছে। স্যার, আমার ছেলে আর নেই। এ সময় প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে স্যার।
বাংলাদেশ সময়: ০:৪৭:৩৬ ৫৫ বার পঠিত