![]()
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া চিকিৎসক, স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও হেলথ ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্য তথ্য ছড়িয়ে হেলথ সাপ্লিমেন্ট বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। বাস্তব মানুষের মতো দেখতে এসব এআই–নির্মিত চরিত্র নানা রোগের ‘অলৌকিক’ সমাধানের দাবি করে পণ্যের প্রচারণা চালাচ্ছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানে এ ধরনের শত শত বিজ্ঞাপনের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই–নির্ভর এসব চরিত্রকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে তাদের সত্যিকারের চিকিৎসক থেকে আলাদা করা কঠিন। চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রন, স্টেথোস্কোপ, আধুনিক চেম্বার ও দেয়ালে ঝোলানো সনদ এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে দর্শকের কাছে তারা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়। এসব বিজ্ঞাপনে ফুড সাপ্লিমেন্টকে বিভিন্ন রোগের কার্যকর সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারী ও বয়স্ক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন তৈরি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এমন স্বাস্থ্য–সুবিধার দাবি করা হয়, যার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিছু পণ্য আবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কিছু বিপণন প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন হাজার হাজার এআই–নির্মিত ভিডিও তৈরি করছে। অল্প খরচে তৈরি এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত ফুড সাপ্লিমেন্টের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য–সম্পর্কিত ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে এআই।
এমনই একটি বিজ্ঞাপনের প্রভাবে ফুড সাপ্লিমেন্ট কিনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৭১ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ট্রাকচালক পামেলা উন্ড্রো। অটোইমিউন রোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে জয়েন্টের ব্যথা, প্রদাহ ও ক্লান্তিতে ভুগছিলেন তিনি। ফেসবুকে মরিঙ্গাভিত্তিক একটি ফুড সাপ্লিমেন্টের বিজ্ঞাপন দেখে রোজাবেলা ব্র্যান্ডের একটি পণ্য অর্ডার করেন। পামেলার মতে, ‘এ ধরনের পণ্যের প্রচারণা তারা খুব দক্ষতার সঙ্গে চালায়।’ কয়েক মাস নিয়মিত সেবনের পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর ব্যবহৃত কিছু ক্যাপসুল দূষিত ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানায়, রোজাবেলার মরিঙ্গা সাপ্লিমেন্টে স্যালমোনেলা জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ওই পণ্য সেবনের পর কয়েকজন অসুস্থও হন। পামেলা জানান, তাঁর স্যালমোনেলার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে সম্পূরকটি সেবনের সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। আগে থেকেই বিভিন্ন স্বাস্থ্যের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, পণ্যটি ব্যবহারের সঙ্গে সেই অবনতির কোনো সম্পর্ক ছিল কি না।
রোজাবেলা ব্র্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রোসিয়া ব্র্যান্ডসের কাছে একাধিকবার মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব এআই–নির্মিত ভিডিওকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পরিচিত পরিবেশ ব্যবহার করা হয়। ভিডিওতে প্রায়ই মার্কিন পতাকা, উপশহরের ঘরবাড়ি কিংবা আধুনিক চিকিৎসাকক্ষের দৃশ্য দেখা যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে এআই–নির্মিত চরিত্রকে চিকিৎসক বা প্রাচ্যের চিকিৎসাপদ্ধতির বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তাদের পেছনের দেয়ালে ভুয়া ডিগ্রি ও সনদ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এআই–নির্মিত এসব চরিত্র ব্যবহার করে খেলনা, প্রসাধনী ও ইলেকট্রনিক পণ্যেরও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কনটেন্ট নির্মাতারা ভিডিওতে অ্যামাজনের পণ্যের সংযোগ যুক্ত করেন। সেই সংযোগ থেকে কেউ পণ্য কিনলে তাঁরা কমিশন পান। চীনের একটি বিপণন প্রতিষ্ঠান এক বছর ধরে টিকটক শপের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য এআই–নির্মিত ভিডিও তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটির ৪০ কর্মী ও শত শত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০টি ভিডিও তৈরি করা হয়। প্রতিটি ভিডিও তৈরিতে ব্যয় হয় প্রায় ১০ মার্কিন ডলার।
যদিও টিকটক জানিয়েছে, বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্য তথ্য প্রচারকারী অ্যাকাউন্ট নিয়মিত অপসারণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মেটার দাবি, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে এআই–নির্মিত কনটেন্টে আলাদা লেবেল যুক্ত করা হচ্ছে। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধান বলছে, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির তুলনায় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা অনেকটাই পিছিয়ে। এ ছাড়া বিজ্ঞাপনে এআই–নির্মিত মানুষের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রে এখনো নির্দিষ্ট কোনো ফেডারেল আইন নেই। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া স্বাস্থ্য পরামর্শদাতার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এআই–নির্মিত এসব চরিত্রের কারণে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য পরামর্শ ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের মধ্যে পার্থক্য করা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ সময়: ৭:২১:২৭ ২০ বার পঠিত