টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ

প্রথম পাতা » প্রধান সংবাদ » টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ
রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬



টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচি যেকোনো দেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের সক্রিয় ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগে টিকাদান কার্যক্রম নতুন গতি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) একসময় দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের অন্যতম সাফল্যের প্রতীক ছিল। এই কর্মসূচির মাধ্যমে পোলিও নির্মূল, ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণ এবং হেপাটাইটিস প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি সময় এই সফল কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে যার ফল আজকের সংকটে প্রতিফলিত হচ্ছে।

দেশের সাম্প্রতিক টিকা সংকট এবং হাম-রুবেলায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা এক নির্মম বাস্তবতা হিসেবে সামনে এসেছে। আক্রান্তদের বড় অংশই ছোট শিশু, প্রায় ৮২ শতাংশই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং দীর্ঘদিনের গাফিলতি, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সমন্বয়হীনতার ফলাফলকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। একটি সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হলে তার কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে যখন দেখা যায় কেন্দ্রীয় গুদামে টিকার মজুত কমে গেছে, মাঠপর্যায়ে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং অনেক স্থানে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে তখন এটি একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার লক্ষণ হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। কোথাও টিকা নেই, কোথাও জনবল নেই এই সমন্বয়হীনতা কোনো সাধারণ ত্রুটি নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল।
নীতিগত কিছু সিদ্ধান্তও এই সংকটকে তীব্র করেছে। পূর্বের কার্যকর ক্রয় ও সরবরাহ কাঠামো যথাযথ বিকল্প প্রস্তুতি ছাড়া পরিবর্তন করার ফলে নতুন ব্যবস্থায় বিলম্ব তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া এবং সময়মতো বিকল্প ব্যবস্থা না নেয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও যদি টিকার ঘাটতি দেখা দেয়, তবে তা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

এই বাস্তবতায় সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। হাম প্রতিরোধে রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। প্রথম ধাপে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে তারা আগে টিকা নিয়েছে কি না, তা বিবেচ্য নয়। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেসব অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসূচি শুরু করা হচ্ছে, যা একটি লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই কর্মসূচির আওতায় আক্রান্ত, অসুস্থ বা সন্দেহভাজন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেয়ার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রমের তদারকিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সরাসরি পরিদর্শনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে মাঠপর্যায়ে যাচ্ছেন এবং অন্যান্য মন্ত্রীরাও দায়িত্ব পালন করছেন। এটি কার্যক্রমের প্রতি সরকারের গুরুত্ব এবং তদারকি জোরদারের একটি ইতিবাচক দিক।
সরকারের পক্ষ থেকে টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে আশ্বস্ত করা হয়েছে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের নির্ধারিত কেন্দ্রে নিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো টিকাদান কর্মসূচিই সফল হতে পারে না।

তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায় এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? অতীতের গাফিলতি নিয়ে আলোচনায় অনীহা প্রকাশ করা হলেও বাস্তবতা হলো, জবাবদিহি ছাড়া কোনো ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে না। কেন টিকার মজুত শূন্যে নেমে এল, কেন সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা হলো না, কেন কার্যকর কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ল এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
কারণ, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অবহেলার মূল্য অনেক বড়। যখন প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু ঘটে, তখন তা কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয় এটি একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও। এই দায় নিরূপণ না করলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকেও নজর দিতে হবে। শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কোভিড-পরবর্তী “ড্রপআউট” সমস্যার সমাধান করে শিশুদের পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের বর্তমান উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয় হলেও অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এখন জরুরি। একটি সুসংগঠিত, জবাবদিহিমূলক এবং টেকসই টিকাদান কর্মসূচিই পারে ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে এবং একটি সুস্থ, নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলাদেশ সময়: ০:৩৪:২০   ৯ বার পঠিত  




প্রধান সংবাদ’র আরও খবর


মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কৃতিত্ব নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দিচ্ছে ইরান
প্রাসঙ্গিক আইনজীবী অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরে এরশাদ, সাধারণ সম্পাদক মমিনুল
টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ
বার কাউন্সিলের নির্বাচন ১৯ মে
জ্বালানিসংকট রোববার থেকে নতুন সময়ে অফিস-ব্যাংক, মার্কেট বন্ধ সন্ধ্যা ৬টায়
চীনে ছড়ালো ভাইরাসজনিত নতুন রোগ, জরুরি সতর্কতা জারি
হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৪ শিশুর মৃত্যু, স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল
মেয়েকে নিয়ে ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ ছবি দেখলেন প্রধানমন্ত্রী
সিঅ্যান্ডএফ অ্যাজেন্ট ফয়সালের ৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ
ভূপাতিত মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের পাইলটকে খুঁজতে ইরানের পুরস্কার ঘোষণা

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ