![]()
দক্ষিণ ইংল্যান্ডের শান্ত একটি এলাকায় অবস্থিত রয়েল এয়ারফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে একটি বিশাল ধূসর সামরিক বিমান নিচ দিয়ে উড়ে এসে অবতরণ করল। এটি ছিল একটি মার্কিন সি-১৩০ হারকিউলিস। গত সপ্তাহে সেখানে অবতরণ করা কয়েকটি মার্কিন বিমানের একটি এটি। এই বিমানগুলোর মধ্যে বি-৫২ বোমারু বিমান এবং বি-১ বোমারু বিমানও আছে। এগুলো অস্ত্রশস্ত্রে বোঝাই করে ইরানে অভিযানের জন্য পাঠানো হয়েছিল। এই বিমান চলাচল অনেক বৃটিশ নাগরিকের মনে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। তখনও এই ঘাঁটিটি মার্কিন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং সেখানে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভও চলছিল।
স্থানীয় অনেক বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে বৃটেনের সম্পৃক্ততা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন, যা দেশের সামগ্রিক জনমতের প্রতিফলন। ফেয়ারফোর্ড শহরের বাসিন্দা ডেভিড আকালা বলেন, এ ব্যাপারে জনগণের কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের প্রজন্ম আমেরিকার প্রতি আস্থা হারিয়েছে। প্রশ্ন হলো, বৃটেন কেন এতটা অনুগত থাকবে?
বাস্তবে, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের সতর্ক অবস্থান তার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি করেছে। স্টারমার প্রথমে ইরানের ওপর হামলায় বৃটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেননি এবং সরাসরি অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বৃটিশ মিত্রদের ওপর ড্রোন হামলা চালানোর পর তিনি অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করেন। তিনি জানান, আরএএফ ফেয়ারফোর্ড এবং ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া যেতে পারে।
কিন্তু এতে ট্রাম্প সন্তুষ্ট হননি এবং বলেন, আমরা এটা মনে রাখব। এই সীমিত অনুমতিও বৃটিশদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ সংঘাতটি দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে এবং জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, বৃটিশদের বড় অংশ এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। ইউগভ-এর জরিপে ৫৯ ভাগ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার বিপক্ষে মত দিয়েছে। আর সারভেশন-এর জরিপে ৬৯ ভাগ মানুষ চায় বৃটেন নিরপেক্ষ থাকুক বা এই যুদ্ধের বিরোধিতা করুক।
স্টারমার জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ব না। তিনি বারবার ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। সেই সময় লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সমর্থনে ইরাকে সেনা পাঠিয়েছিলেন। যার জন্য তাকে ‘বুশের অনুগত’ বলেও সমালোচনা করা হয়।
স্টারমার বলেন, তিনি ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কিন্তু তিনি তার নীতিতে অটল। ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এটি ১৯৪৪ সালে ডি-ডে অভিযানের প্রস্তুতির সময় স্থাপন করা হয়। এর দীর্ঘ রানওয়ে ভারী মার্কিন বোমারু বিমান ব্যবহারের জন্য উপযোগী। স্থানীয় এমপি রোজ স্যাভেজ বলেন, এই ঘাঁটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গর্ব রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর অনেকেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক কার্যক্রমের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যদি প্রতিরক্ষা বলতে ইরানের অস্ত্র কারখানায় হামলা বোঝায়, তাহলে সেটি তো আক্রমণাত্মকই মনে হয়। ইউরোপিয়ান কমান্ড নিরাপত্তার কারণে ঘাঁটিতে থাকা বিমান বা তাদের মিশন সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। লিবারেল ডেমোক্রেটস দলটি এ বিষয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা চেয়েছে। রোজ স্যাভেজ বলেন, যুদ্ধের লক্ষ্য পরিষ্কার না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
এদিকে কিছু বৃটিশ নাগরিক ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থনও করছেন। ক্লাইভ ব্রাউন বলেন, আমাদের সরকার ট্রাম্পের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি। পুরোপুরি যুদ্ধে না গেলেও আমাদের আরও সমর্থন দেয়া উচিত ছিল। স্থানীয় বিমানপ্রেমী ডেভিড ম্যাকগিল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই এই ঘাঁটি ব্যবহার করছে। তবে তিনি ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে একমত নন, বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এদিকে ইরান বৃটেনকে এই সংঘাতে জড়ানো থেকে সতর্ক করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তারা বৃটেনকে শত্রু মনে করে না। তবে কেউ সামরিকভাবে যুক্ত হলে তাকে ‘আগ্রাসনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ফেয়ারফোর্ডের বাসিন্দা কেটি ম্যাকমাহন বলেন, কিছুটা ভয় তো আছেই। তবে শুধু এখানে নয়, পুরো বৃটেনই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
বাংলাদেশ সময়: ১৩:১৬:৫৭ ৯ বার পঠিত