বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচন গণভোটের ফাঁদে গণতন্ত্র নাকি বাংলাদেশ?

প্রথম পাতা » জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ » নির্বাচন গণভোটের ফাঁদে গণতন্ত্র নাকি বাংলাদেশ?
মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬



গণভোটের ফাঁদে গণতন্ত্র নাকি বাংলাদেশ?

শিক্ষার্থীদের কোনো একটি প্রশ্নের জবাবে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ উত্তর দিতে বললে উত্তর না জানলে তাদের অধিকাংশ ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেবে। এই মানসিক প্রবণতা শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, সব মানুষেরই। মানুষ এসব ক্ষেত্রে স্বভাবতই নানা কারণে ইতিবাচকতার দিকে ঝুঁকে থাকে। কারণগুলো নিয়ে গত একশ বছরে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। আন্তনিও গ্রামসি ও রেনসিস লেকার্ট থেকে ড্যানিয়েল কাহনেম্যান ও নোয়াম চমস্কি হয়ে হালের টালি শ্যারট পর্যন্ত বহু মনোবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক মাথা ঘামিয়েছেন। আমরা সেদিকে না গিয়ে বরং গণভোট ব্যাপারটা বোঝার জন্য একটু মাথা খাটাই, যেহেতু মাথা না খাটিয়ে ব্যাপারটা বোঝার কোনো উপায় নেই।

আমাদের এবারের গণভোটে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের এই নির্বাচনে ধরা যাক মাত্র ৫০ হাজার মানুষ ভোট দিল। এই ভোটের মধ্যে মাত্র ৩০ হাজার ‘হ্যাঁ’ ভোট। ব্যস। সিদ্ধান্ত হয়ে গেল পুরো জাতির। মাননীয় স্পিকারের মতো করে নির্বাচন কমিশনও ঘোষণা দিয়ে দেবে, ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। কারণ, গণভোটে মোট ভোটারের কত শতাংশ ভোট দিলে সেই গণভোট বৈধ হবে তা তো আইন ও বিধিবিধানের কোথাও বলা নেই। এমনকি মোট কাস্টিং ভোটের কত শতাংশ পেলে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জয়ী হবে, তা-ও তো বলা নেই কোথাও। একজন প্রার্থীর ন্যূনতম কত ভোট পেতে হবে তা বলা আছে, কিন্তু নির্বাচন নিজে ন্যূনতম কত ভোট পেলে সেটা নির্বাচন তাই বলা নেই বিধিবিধানের কোথাও। এটাও এক গণ-অনুপস্থিতি সামাল দেওয়ার রাজনীতির আজব কৌশল।

গণভোটের আরও একটা তেলেসমাতি আছে। ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিলেও ‘হ্যাঁ’, আবার ভোট না দিলেও ‘হ্যাঁ’। অর্থাৎ, বিয়ের পাটিতে বসা লাজুক কনের সম্মতির মতোই আমাদের এই ‘হ্যাঁ’। বিয়েতে কনে যদি মুখ ফুটে ‘কবুল’ না-ও বলে তাতেও যেমন ধরে নেওয়া হয় সে সম্মত, ভোটারের সম্মতি ‘হ্যাঁ’-এর ক্ষেত্রেও তেমনই। রাজি না থাকলে কনেকে যেমন স্পষ্ট ‘না’ বলতে হবে, তেমনি ভোটারদের কেউ ‘না’ ভোট দিতে চাইলে ভোটদানে বিরত থাকলে চলবে না, বিয়ের কনের মতো নীরব থাকলে চলবে না, স্পষ্ট করে ‘না’ ভোট দিতে হবে।

তার মানে, ভোটের ‘হ্যাঁ’-কে জেতাতে ‘হ্যাঁ’ নিজেই যথেষ্ট। তার ওপর ‘হ্যাঁ’-কে জেতানোর পক্ষে আছে খোদ সরকার ও তাদের প্রশাসনের পরোক্ষ ইচ্ছা। যে ইচ্ছা নির্বাচনের তপশিস ঘোষণার পরও প্রত্যক্ষই ছিল, অর্থাৎ সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরাসরি প্রচারণায় নেমেছিল, পরে তা থেকে সরে এসেছে। এবারের নির্বাচনে বড় যে দলগুলো অংশ নিচ্ছে তারাও আছে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, বেচারা ‘না’-এর পক্ষে সিপিবির মতো কয়েকটি দল ছাড়া আর কেউ নেই। এমনকি ভোটের মাঠে বিএনপির মতো প্রধানতম দলকেও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে নিমরাজিভাবে হলেও প্রচার চালাতে হচ্ছে।সংস্কার কমিশনের যেসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বিএনপি বা অন্য কোনো দল একমত হতে পারেনি, যেগুলোকে বলা হচ্ছে ‘নোট অব ডিসেন্ট’, সেসব ব্যাপারেও তাদের ‘হ্যাঁ’ বলতে হচ্ছে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে নেমে। রাজনৈতিক জ্ঞানবুদ্ধিতে পাকা নেতারাও যেসব বিষয়ে একমত হতে পারেননি সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে চাষাভুষা মোটে-মজুর আর তুলনামূলক কম রাজনৈতিক জ্ঞানের সাধারণ ভোটারদের। এটাকে ‘অনির্বাচিতদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের ভার’ বললে কি ভুল হবে? রাজনীতির কেতাবি ভাষায় এসব ক্ষেত্র ধরেই বোধহয় আলোচনায় আসে ডিফল্ট কনসেন্ট বা ধার্য সম্মতি, পূর্বনির্ধারিত গণভোট কিংবা কাঠামোগত অসম গণতন্ত্র। রূপকথায় দানবকে দানবীয় রূপে দেখা যায়, বাস্তবে দানব হাজির হয় সবসময় ফুটফুটে চেহারায়। কর্তৃত্ববাদও সবসময় বাহ্যিক ভয়াল রূপ নিয়ে হাজির হয় না। গণভোটের আইনের ভাষায় মিথ্যা কিছু নেই, যা একটু কূটকৌশল থাকলে থাকতেও পারে, সেই কৌশলী ভাষায় চুপিচুপি কর্তৃত্বের ব্যাপারটা হাসিল হলেই হলো।

গণভোটের প্রচারে সরকারের পোস্টারগুলো এখনো সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঝুলছে। একটি পোস্টারে লেখা আছে ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’। এই পোস্টার দেখলেই বোকা সেই দুই ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। তারা একবার সফরে বেরিয়েছিল। রাতের বেলা এক শহরের এক রেলস্টেশনে প্ল্যাটফর্মের মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়ল তারা। ঘুম থেকে সকালে উঠে ছোট ভাই দেখল, তাদের সহায়-সম্বল আর কাপড়চোপড়ের ছোট বাক্সটি কোথাও নেই। বাক্সটি চুরি হয়ে গেছে। ছোট ভাই বড় ভাইকে ঘুম থেকে ডেকে উঠিয়ে বলল, ‘ভাই, বাক্স তো চোরে নিয়ে গেছে।’ বোকা বড় ভাই তখন নিজের কোমর থেকে চাবি বের করে দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে বলছে, ‘বাক্স নিয়ে কী করবে, চাবি তো আমার কাছে। তালা খুলবে কেমনে?’

বাংলাদেশে ভোট আর গণতন্ত্র যে খানিকটা প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁদে পরিণত হয়েছে তার সর্বশেষ উদাহরণ বোধহয় এই গণভোট। যেখানে নির্বাচন আছে, ভোট আছে, কিন্তু পছন্দ করার কিংবা বোঝার সুযোগ সীমিত। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এই সীমার দিকে ইঙ্গিত করেই এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর পাশে যদি ‘বুঝি না’ অপশন থাকত, তাহলে গণভোটে ‘বুঝি না’ বিকল্পে হয়তো বেশি ভোট পড়ত। গণভোটে দৃশ্যত নাগরিকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে এই গণভোট ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার একটা প্রথাগত আয়োজনই।

এখন এটাকে কেউ যদি ‘গণতন্ত্রের নামে গণভোটের ফাঁদ’ মনে করে তবে তো তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। কেননা গণভোট সরকারের, কিন্তু উপলব্ধি তো যার যার। দেখা যাক, গণভোটের এই ফাঁদে বাংলাদেশ আটকে যায়, নাকি ফাঁদ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। সেটি দেখার জন্যই এই ভোটের দিকে এবং ভোট পেরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকা।

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ: লেখক ও সাংবাদিক

বাংলাদেশ সময়: ১৭:৩৪:২৪   ৫৫ বার পঠিত