![]()
বাংলাদেশে একটি রূপান্তরমুখী সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে, ৯ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন এমন একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে, যা দেশের অর্থনৈতিক গতিপথকে মৌলিকভাবে পুনর্গঠন করতে পারে।
দেশের ভেতরে সমালোচকরা এ সময় নির্ধারণকে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক বৈধতা নিশ্চিত করার প্রয়াস বলে ব্যাখ্যা করছেন অনেকে। তবে বাস্তবে এই চুক্তির পেছনে রয়েছে আরও গভীর এবং প্রায় অস্তিত্বগত অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
নভেম্বর ২০২৬-এ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের চূড়ান্ত সময়সীমার দিকে দেশ যখন এগোচ্ছে, তখন এই ‘কটন-ফর-গার্মেন্টস’ চুক্তি বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সুবিধাগুলো ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলকে রক্ষা করার একটি কৌশলগত প্রয়াস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট। ২৪ নভেম্বর ২০২৬ নির্ধারিত এলডিসি উত্তরণ এমন এক যুগের অবসান ঘটাবে, যা কয়েক দশক ধরে শুল্কমুক্ত ও একতরফা বাজারসুবিধার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। একটি এমন অর্থনীতির জন্য, যেখানে তৈরি পোশাক খাতই মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান দেয়, এই রূপান্তরের ঝুঁকি অপরিসীম।
পলিসি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারালে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। যার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে শুরু করে শিল্পখাতে কর্মসংস্থান পর্যন্ত।
এই ঝুঁকি আরও তীব্র হয়েছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগ্রাসী সম্প্রসারণে। দেশ দুটি পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে স্থায়ী ও কাঠামোগত বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার। সেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি ইতিমধ্যে প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কের মুখোমুখি হন। যার ফলে কিছু পোশাক পণ্যে কার্যকর শুল্কহার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ শতাংশে। এই ‘শুল্কপ্রাচীর’ যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা স্থিতিশীল থাকলেও রপ্তানি পরিমাণ হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে।
নতুন বাণিজ্য চুক্তিটি এই প্রাচীর ভাঙার লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি উদ্ভাবনী সরবরাহ-শৃঙ্খলভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে। ‘স্কয়ার-মিটার বিনিময়ে স্কয়ার-মিটার’ নীতির আওতায়, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত কাঁচা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু যতটা আমদানি করবে, তার অনুপাতে পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্য পূরণ করে, অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শুল্ক-সুরক্ষা দেয়।
তবে চুক্তিটি শুধু শুল্ক ছাড়েই সীমাবদ্ধ নয়। পারস্পরিক শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার শর্ত হিসেবে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দাবি করে আসছিল, সেগুলোর একটি প্যাকেজে সম্মত হয়েছে ঢাকা। এর মধ্যে রয়েছে ই-কমার্সে শুল্ক আরোপে স্থগিতাদেশ, মেধাস্বত্ব (আইপিআর) আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কার উদ্যোগে সমর্থন প্রদান।
এই অঙ্গীকারগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, এলডিসি-উত্তর বিশ্বে টিকে থাকতে বাংলাদেশকে উচ্চমানের বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের জন্য আরও পরিশীলিত ও বিশ্বাসযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে- এই বাস্তবতা ঢাকায় স্বীকৃত হচ্ছে।
চুক্তিটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি, ‘জুলাই চার্টার’-এর ভার বহন করে কাজ করছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই বাণিজ্য চুক্তি সরকারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান প্রমাণ। এটি দেশীয় ভোটার ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি বার্তা দেয় যে, রাজনৈতিক রূপান্তর সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত।
নির্বাচনের আগেই চুক্তিটি সই করে ইউনূস প্রশাসন কার্যত দেশের ভবিষ্যৎ নীতিকাঠামোর ভেতরে একটি প্রো-পশ্চিমা বাণিজ্যিক অভিমুখ স্থায়ীভাবে প্রোথিত করে দিচ্ছে, যা পরবর্তী কোনো সরকারের জন্য সহজে উল্টে দেয়া কঠিন হবে।ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই চুক্তি বাংলাদেশের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার কৌশলের অংশ। একদিকে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা- এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক বিনিয়োগকারী এবং শিল্পপণ্যের চূড়ান্ত ভোক্তা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঢাকা যেন কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল না হয়ে পড়ে, সে ভারসাম্য রক্ষা করে।
একই সঙ্গে এটি মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার কারণে মাঝেমধ্যে টানাপোড়েনে পড়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে স্থিতিশীল রাখার একটি বাস্তববাদী পথ তৈরি করে। তবে চুক্তি স্বাক্ষর মানেই সবকিছুর সমাধান নয়, এটি কেবল শুরু। প্রকৃত পরীক্ষা হবে নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবায়নে। অতীতে বন্দর অবকাঠামোর দুর্বলতা, কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং শ্রম মানদণ্ডে স্বচ্ছতার অভাব বাংলাদেশে বাণিজ্য সুবিধার পূর্ণ সুফল পেতে বাধা সৃষ্টি করেছে।
নতুন চুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে পরবর্তী সরকারকে লজিস্টিকস ও ডিজিটাল বাণিজ্য অবকাঠামোয় কঠোর সংস্কার আনতে হবে। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও শ্রম ব্যয়ের চাপের মুখে ১৫ শতাংশ শুল্কহারও অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হতে পারে। এ চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি মডেলের স্থায়িত্ব নিয়েও বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে। পোশাক খাতকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও এটি উচ্চমূল্য সংযোজনযুক্ত উৎপাদন ও সেবা খাতে বৈচিত্র্য আনার মৌলিক চ্যালেঞ্জের সমাধান দেয় না। মানবসম্পদে বৃহৎ বিনিয়োগ ছাড়া সেই রূপান্তর সম্ভব নয়, যার স্পষ্ট রূপরেখা এখনো অনুপস্থিত।বিশ্ব যখন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে, তখন ৯ ফেব্রুয়ারির ওয়াশিংটন স্বাক্ষর অনুষ্ঠান একটি শক্তিশালী প্রস্তাবনা। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে শেষ বিচারে রাজনৈতিক স্থায়িত্বের চাবিকাঠি অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই।
বাংলাদেশের জন্য এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির জানালা দ্রুত বন্ধ হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিই হয়তো সেই সময়ের মধ্যে অর্জিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, যাতে জানালা বন্ধ হলে পোশাক কারখানার আলো নিভে না যায়। এই চুক্তি নতুন সমৃদ্ধির ভিত্তি হবে নাকি অর্থনৈতিক সংকোচনের এক পাদটীকা, তা নির্ভর করবে আসন্ন নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।(লেখক ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকার ভিজিটিং স্কলার এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট। তার এ লেখাটি অনলাইন এশিয়া টাইমস থেকে অনুবাদ)
বাংলাদেশ সময়: ১৩:১১:৩৬ ৪২ বার পঠিত