অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় আল-খলিল শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে প্রায় ২৫০টি পরিবারের দেড় হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শুক্রবার থেকে তাঁদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরও আড়াই হাজার ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
এক বিবৃতিতে আল-খলিল পৌরসভা জানায়, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো দেইর বাহা ও আল-জিলদা এলাকায় বসবাস করত। এই দুই এলাকায় মোট ৫০০টি পরিবার রয়েছে।
পৌরসভা আরও জানায়, ইসরায়েলি বাহিনী উচ্ছেদের জন্য নির্ধারিত বাড়িগুলো চিহ্নিত করেছে। অবশিষ্ট পরিবারগুলোকে নিজেদের যানবাহন ছাড়াই বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ বিতরণ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফাকে দেওয়া বক্তব্যে আল-খলিলের গভর্নর খালেদ দুদিন বলেন, চলমান ইসরায়েলি অভিযানে ২০০টিরও বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তিনি ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড বন্ধে জরুরি আন্তর্জাতিক ও আইনি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, শুক্রবার জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর গভর্নরেট কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও গোত্রীয় সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় একটি সংকট ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র ও প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রণালয় শনিবার সতর্ক করে বলেছে, আল-খলিলের বিভিন্ন এলাকায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বাড়ানো, বাসিন্দাদের উচ্ছেদ এবং আবাসিক এলাকা ধ্বংসের হুমকি দিয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন।
মন্ত্রণালয় এসব হুমকিকে ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র পুনরাবৃত্তি এবং জাতিগত নিধন অভিযান চালানোর প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাপ সৃষ্টির জন্য ফিলিস্তিনের দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
শুক্রবার থেকে আল-খলিলে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ফার্শ আল-হাওয়া এলাকায় ভবন ও বাণিজ্যিক দোকানপাট ভেঙে দেওয়া, বাড়িঘরে তল্লাশি এবং অন্তত ১৩ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শহর, গ্রাম, জনপদ ও শরণার্থীশিবিরগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদের পর বহু পরিবারকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর দিকে যাওয়া সড়কগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে ইসরায়েলি বাহিনী শহরের বিভিন্ন ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভা জানিয়েছে, ২০২২ সালের শেষ দিকে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তারা ১০৪টি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ১৬০টি কৃষিভিত্তিক বসতি-চৌকি স্থাপন করা হয়েছে।
ইসরায়েল বসতি নির্মাণের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করেছে, আগে অনুমোদন ছাড়াই গড়ে ওঠা বসতি-চৌকিগুলোকে বৈধতা দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমিতে বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ করেছে।
একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়গুলোর ওপর অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলাও বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে রয়েছে শারীরিক আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, ফসল ও গবাদিপশুর ক্ষতিসাধন এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এক পরামর্শমূলক অভিমতে বলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতি বেআইনি। আদালত অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ উপস্থিতির অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছে, বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড আরও খণ্ডবিখণ্ড হবে, বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুতি বাড়বে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আল-খলিলে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। সংস্থাটির মহাসচিব ইসমাইল উলদ শেখ আহমেদ এই অভিযানকে ইসরায়েলি বাহিনী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির নীতির আওতায় বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনার লক্ষ্য আল-খলিল ও আশপাশের এলাকার জনতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা।
ওআইসির মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিতভাবে ভবন ধ্বংস করা এবং ব্যাপক হারে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশনগুলোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি শহরের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ওপর ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডেরও নিন্দা জানান। এর মধ্যে রয়েছে আল-খলিলের ইব্রাহিমি মসজিদ বন্ধ রাখা এবং মুসল্লিদের সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়া। পার্সটুডে
বাংলাদেশ সময়: ২০:২২:০১ ৮ বার পঠিত #আরও #ইসরায়েল #করল #জনকে #ফিলিস্তিনিকে #বাস্তুচ্যুত #১৫০০ #২৫০০