ডিজিটাল যুগে মূল দলিল পুড়িয়ে ফেলা বা নষ্ট করার সংস্কৃতি হতে বের হয়ে আসা কি খুব অসম্ভব?

প্রথম পাতা » প্রধান সংবাদ » ডিজিটাল যুগে মূল দলিল পুড়িয়ে ফেলা বা নষ্ট করার সংস্কৃতি হতে বের হয়ে আসা কি খুব অসম্ভব?
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬



নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া লাগলেও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর একটি চিরচেনা চিত্র এখনো বদলায়নি। জমি কেনাবেচার পর মূল দলিল হাতে পেতে নাগরিকদের অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অপেক্ষার প্রহর ৩ থেকে ৫ বছর কিংবা তারও বেশি দীর্ঘ হয়। এই দীর্ঘ সময়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুমে পড়ে থেকে বহু মূল্যবান মূল দলিল উইপোকায় কাটছে, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে, এমনকি অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনায় পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার নজিরও রয়েছে। এছাড়া কয়েক বছর পর মূল দলিল পুড়িয়ে ফেলা হয়। যার  ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।

স্মার্ট বাংলাদেশের এই যুগে যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), বায়োমেট্রিক ও মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে নিমিষেই নাগরিক পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেখানে মূল দলিল পেতে কেন এই আদিম আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি? গ্রহীতার খরচে কুরিয়ার বা ডাক বিভাগের মাধ্যমে কেন মূল দলিল সরাসরি ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়? এমন প্রশ্ন এখন সময়ের দাবি।

মূল দলিল আটকে থাকার মূল কারণ কী?

দলিল নিবন্ধনের সময় ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’-এর ৫২ ধারা অনুযায়ী গ্রহীতাকে একটি সাময়িক রসিদ দেওয়া হয়। এরপর দলিলের হুবহু অনুলিপি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ‘বালাম বইতে’ (Volume Book) হাতে লিখে বা টাইপ করে সংরক্ষণ করতে হয়।

এই বালাম বইতে নকল লেখার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মূল দলিল গ্রহীতাকে ফেরত দেওয়া যায় না। জনবল সংকট, সনাতন কার্যপদ্ধতি এবং বিপুল পরিমাণ দলিলের চাপের কারণে এই নকল লেখার কাজ শেষ হতেই কয়েক বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক গ্রহীতা ৫২ ধারার রসিদ হারিয়ে ফেলেন, আবার অনেকে দীর্ঘদিন পর মূল দলিল তুলতে গিয়ে দেখেন তা রেকর্ড রুমে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অথবা নষ্ট হয়ে গেছে।

---

এনআইডি ও মোবাইল নম্বর থাকতেও কেন এই দূরত্ব?

বর্তমানে প্রতিটি দলিল নিবন্ধনের সময় দাতা ও গ্রহীতার এনআইডি কার্ড, সচল মোবাইল নম্বর এবং স্থায়ী/বর্তমান ঠিকানা বাধ্যতামূলকভাবে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের সব তথ্য থাকার পরও এই মূল্যবান আইনি দস্তাবেজটি কেন নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যাচ্ছে না—তা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ভুক্তভোগীদের।

সরকার চাইলে একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন বালাম বইতে অন্তর্ভুক্তি শেষ হওয়ার ১ সপ্তাহ) পর স্বয়ংক্রিয় এসএমএস (SMS)-এর মাধ্যমে গ্রহীতাকে মূল দলিল প্রস্তুতের বিষয়টি জানাতে পারে। এরপর গ্রহীতা যদি স্বশরীরে আসতে না পারেন, তবে তাঁর প্রদত্ত ঠিকানায় ডাক বিভাগ বা অনুমোদিত কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ক্যাশ অন ডেলিভারি বা গ্রহীতার খরচে দলিলটি নিরাপদে পাঠিয়ে দেওয়া অত্যন্ত সহজ একটি প্রক্রিয়া হতে পারে।

ডাক বিভাগের মাধ্যমে অন্য সেবা চললে দলিলে কেন নয়?

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়িয়েছে। বর্তমানে ই-পর্চা, খতিয়ান বা দলিলের সার্টিফাইড কপি (নকল) ফি প্রদান সাপেক্ষে ডাক বিভাগের (Post Office) মাধ্যমে সরাসরি নাগরিকদের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। যদি দলিলের সার্টিফাইড কপি কুরিয়ার বা পোস্ট অফিসে পাঠানো সম্ভব হয়, তবে মূল দলিল কেন নয়?

নিরাপত্তা ও জালিয়াতির আশঙ্কার যে অজুহাত দেওয়া হয়, তা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই সমাধান সম্ভব। দলিলটি কুরিয়ারে পাঠানোর সময় ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) সিস্টেম এবং গ্রহীতার এনআইডি কার্ডের ফেস-ম্যাচিং বা বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কেবল প্রকৃত মালিকের হাতেই দলিলটি হস্তান্তর নিশ্চিত করা সম্ভব।

স্থায়ী সমাধান: ‘ই-রেজিস্ট্রেশন’ ও ডিজিটাল বালাম

বিশেষজ্ঞদের মতে, কুরিয়ারে পাঠানো সাময়িক সমাধান হলেও স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশনে। সরকার দেশের কিছু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ই-রেজিস্ট্রেশন’ চালু করেছে, যেখানে দলিলের তথ্য সরাসরি কম্পিউটারে ইনপুট হয়ে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল বালাম তৈরি হয়। এর ফলে নিবন্ধনের দিন বা তার পরের দিনই মূল দলিল গ্রহীতার হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে সারা দেশে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হতে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি।

একজন নাগরিক জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে জমি কেনার পর যদি তাঁর মূল মালিকানার কাগজটিই বছরের পর বছর সরকারি দপ্তরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে, তবে তা কোনোভাবেই ‘স্মার্ট গভর্ন্যান্স’-এর লক্ষণ নয়। ই-রেজিস্ট্রেশন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হওয়ার আগ পর্যন্ত, অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে এনআইডি ও কুরিয়ার সার্ভিসকে কাজে লাগিয়ে মূল দলিল হোম-ডেলিভারি দেওয়ার উদ্যোগ নিলে তা দেশের কোটি কোটি মানুষের ভোগান্তি ও জালিয়াতির পথ বন্ধ করবে। সরকার কি এই জনবান্ধব উদ্যোগটি গ্রহণ করবে?

বাংলাদেশ সময়: ১৫:৫২:১৫   ১৫৬ বার পঠিত  




প্রধান সংবাদ’র আরও খবর


আসামে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনে বড় পরিবর্তন: কাজীদের পরিবর্তে দায়িত্ব পেলেন সরকারি রেজিস্ট্রার
২ দিনে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ৪,৬৫৬ মামলা
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণ: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দেখার আহ্বান এরদোয়ানের
ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু
যুক্তরাষ্ট্রে ভিসার মেয়াদের বেশি অবস্থান করলে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার সতর্কতা
ডিজিটাল যুগে মূল দলিল পুড়িয়ে ফেলা বা নষ্ট করার সংস্কৃতি হতে বের হয়ে আসা কি খুব অসম্ভব?
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে প্রহসনের অভিযোগ নাহিদ ইসলামের
জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভ, অস্কারজয়ী অভিনেত্রীসহ আটক ১০৩
পাকিস্তানি সাংবাদিকের প্রশ্নে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জয়শঙ্করের
হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায়

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ