শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

চার বিচারপতিতে সীমিত আপিল বিভাগ, বাড়ছে বিচারাধীন মামলার চাপ

প্রথম পাতা » সুপ্রিমকোর্ট » চার বিচারপতিতে সীমিত আপিল বিভাগ, বাড়ছে বিচারাধীন মামলার চাপ
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬



চার বিচারপতিতে সীমিত আপিল বিভাগ, বাড়ছে বিচারাধীন মামলার চাপ

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ বর্তমানে তীব্র বিচারকসংকটে রয়েছে। সম্প্রতি একজন বিচারপতি অবসরে যাওয়ায় এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বিচারকস্বল্পতার কারণে একাধিক বেঞ্চ গঠন করে বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় দ্রুত আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

তাদের ভাষ্য, আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অতীতে মামলার জট নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩১ হাজারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলাও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একাধিক বেঞ্চ গঠন প্রয়োজন। কিন্তু বিচারকসংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যোগ্য, দক্ষ ও সৎ বিচারকদের আপিল বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হলে মামলা জট নিরসনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন।

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ চারজন বিচারপতি রয়েছেন। অথচ ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ১১ জন। এরপর আর কখনো এতসংখ্যক বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পাঁচ দিন পর ছাত্র-জনতার দাবির মুখে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি পদত্যাগে বাধ্য হন। পরে হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর ওই বছরের ১২ আগস্ট আপিল বিভাগে আরও চারজন বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন বিচারপতির সংখ্যা বেড়ে ছয়জনে দাঁড়ায়। সে সময় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এক নম্বর এজলাসে বিচারকাজ পরিচালনা করতেন। অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামকে প্রধান করে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে আরেকটি বেঞ্চ গঠন করা হয়। ফলে আপিল বিভাগের দুটি বেঞ্চে বিচারকাজ চলত।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল করিম অবসরে যান। পরের বছরের মার্চে রাষ্ট্রপতি আরও দুজন বিচারপতিকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দিলে বিচারপতির সংখ্যা সাতজনে উন্নীত হয়। পরে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং চলতি বছরে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান অবসরে গেলে বিচারপতির সংখ্যা কমে চারজনে নেমে আসে। ফলে বিচারকস্বল্পতার কারণে বর্তমানে দুটি বেঞ্চ গঠন করে বিচারকাজ পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না।

অথচ অতীতে আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চেও বিচারকাজ পরিচালিত হয়েছে। ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আপিল বিভাগের আট বিচারপতিকে নিয়ে তিনটি বেঞ্চ পুনর্গঠন করেছিলেন। আইনজীবীদের মতে, সে সময় তিনটি বেঞ্চে বিচারকাজ চলায় মামলা নিষ্পত্তিতে গতি এসেছিল।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. বদরুদ্দোজা বাদল গণমাধ্যমকে বলেন, আপিল বিভাগে বিচারকসংকট রয়েছে। অবিলম্বে এমনসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া উচিত, যাতে তিনটি বেঞ্চ গঠন করে বিচারকাজ পরিচালনা করা যায়। এটি সম্ভব হলে মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়বে এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমবে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম বলেন, আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিয়ে আরও দুটি বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন। যত বেশি বেঞ্চ গঠন করা যাবে, মামলা নিষ্পত্তির হারও তত বাড়বে। এর সুফল পাবেন বিচারপ্রার্থীরা।

এদিকে আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগের অনুরোধ জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। চিঠিতে তিনি বলেন, আইনজীবী হিসেবে বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা, আদালতের কর্মব্যস্ততা এবং বিচারব্যবস্থার বাস্তব চিত্র প্রতিদিন কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়। কিন্তু প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতায় বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বর্তমান সময়ে আইনের বিভিন্ন বিশেষায়িত শাখা বিকশিত হওয়ায় বিশেষায়িত বেঞ্চ গঠনও জরুরি। কিন্তু আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা কম থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। বিচারাধীন মামলার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা কমানো এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা ছিল চারজন। তখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৬টি এবং দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৪৩ লাখ। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৮১ লাখ। এখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার ৭১৩টি, অথচ বিচারপতির সংখ্যা মাত্র চারজন।

সুপ্রিম কোর্টের ২০২৪ সালের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতির বিপরীতে বিচারাধীন মামলা ছিল ৫ হাজার ২৬০টি। ২০১১ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ১০ জন, মামলা ছিল ১২ হাজার ৪৪১টি। ২০১৩ সালে ১০ জন বিচারপতির বিপরীতে বিচারাধীন মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৩৩৮টি। ২০১৭ সালে ৯ জন বিচারপতির সময়ে বিচারাধীন মামলা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৫টি। ২০২২ সালে ৯ জন বিচারপতির বিপরীতে মামলা বেড়ে হয় ১৯ হাজার ৯২৮টি। আর ২০২৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩১ হাজার ১২০টি। অর্থাৎ মামলার সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও বিচারপতির সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি। আইনজীবীদের মতে, বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগে আরও বিচারপতি নিয়োগ প্রয়োজন। পর্যাপ্ত বিচারপতি নিয়োগ করা গেলে তিনটি বেঞ্চ গঠন সম্ভব হবে এবং মামলা জট নিরসনে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ সময়: ২০:৩২:৩৪   ১৫ বার পঠিত