![]()
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে নায়ক হওয়ার জন্য কখনো কখনো একটি মুহূর্তই যথেষ্ট! ফেরান তোরেসের জন্য সেই মুহূর্তটি এলো আজ নিউ জার্সির ফাইনালে, যখন অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে তার বাঁ পায়ের শট স্পেনকে এনে দিল বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ শিরোপা। ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে ফেললেন ২৬ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালের আগে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তোরেস ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গোলের দেখা না পাওয়া এই ফরোয়ার্ডের ঝুলিতে ছিল কেবল পর্তুগালের বিপক্ষে একটি অ্যাসিস্ট। তবে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তার ওপর আস্থা হারাননি। নির্ধারিত সময়ের ৬২ মিনিটে মিকেল ওইয়ারসাবালের বদলি হিসেবে মাঠে নামার পরই বদলে যায় ম্যাচের গল্প!
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে পেদ্রো পোরোর নিখুঁত ক্রস, নিকো উইলিয়ামসের হেড আর তোরেসের দুর্দান্ত ফিনিশিং-এই তিন স্পর্শেই আর্জেন্টিনার জালে বল জড়িয়ে যায়। সেই একমাত্র গোলই স্পেনকে এনে দেয় বিশ্বজয়ের মুকুট। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে বদলি হিসেবে গোল করা পঞ্চম ফুটবলার এবং ২০১৪ সালে মারিও গোটশের পর প্রথম বদলি গোলদাতা হিসেবে জায়গা করে নেন তোরেস!
শিরোপা জয়ের পর আবেগাপ্লুত তোরেস নিজের কৃতিত্বকে ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখতে চাননি। তার ভাষায়, এই গোল গোটা স্পেনের মানুষের। বিশ্বকাপজুড়ে কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার পর ফাইনালে গোল করতে পেরে স্বস্তির কথাও জানান তিনি। তার বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রমেরই শেষ পর্যন্ত প্রতিদান মিলেছে।
আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। প্রায় এক দশক আগে স্পেনের তৃতীয় বিভাগের একটি ম্যাচে ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে অভিষেক হয়েছিল লাজুক এক কিশোরের। সেই ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স অনেকের মনেই দাগ কাটেনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অচেনা কিশোরই হয়ে ওঠেন বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত মুখ।
স্পেনের ফইওস শহরে জন্ম নেওয়া তোরেস মাত্র ছয় বছর বয়সে ভ্যালেন্সিয়ার একাডেমিতে যোগ দেন। শৈশবে গ্যালারিতে বসে প্রিয় ক্লাবের পতাকা ওড়ানো ছেলেটিই পরে মূল দলে জায়গা করে নেন এবং এই শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া প্রথম লা লিগা ফুটবলার হিসেবে অভিষেকের কীর্তি গড়েন। তবে ভ্যালেন্সিয়া ছাড়ার সময় তাকে ক্লাব রাজনীতি, সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মাত্র ২০ বছর বয়সে ৯৭ ম্যাচ খেলে বিদায় নেওয়ার সময় তার সঙ্গে ছিল একরাশ অভিমান। কিন্তু নিজের এবং বোনের গোড়ালিতে খোদাই করা একটি বাক্য—‘আই রিফিউজ টু সিঙ্ক’-তার জীবনের দর্শন হয়ে ওঠে। প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার সেই মানসিকতাই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
ম্যানচেস্টার সিটিতে পেপ গুয়ার্দিওলার অধীনে এবং পরে বার্সেলোনায় খেলেও তোরেসকে প্রতিনিয়ত নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হয়েছে। তবে জাতীয় দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনেই তার সেরাটা ফুটে ওঠে। বয়সভিত্তিক দল থেকেই তোরেসের সামর্থ্য সম্পর্কে ভালোভাবে জানা এই কোচ তাঁকে এমন এক ভূমিকায় গড়ে তোলেন, যেখানে গতি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং দলীয় ফুটবলের সমন্বয়ে তিনি হয়ে ওঠেন স্পেনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য আক্রমণভাগের অস্ত্র!
শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফাইনালই তোরেসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে রইল। দীর্ঘ সময় গোলশূন্য থাকার হতাশা, ক্যারিয়ারের নানা প্রতিকূলতা এবং অবহেলার সব গল্পকে ছাপিয়ে একটি গোলই তাকে পৌঁছে দিয়েছে অমরত্বের কাতারে। স্পেনের বিশ্বজয়ের ইতিহাসে তাই ফেরান তোরেস এখন কেবল একজন গোলদাতা নন, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে শীর্ষে ওঠার এক অনন্য প্রতীক।
বাংলাদেশ সময়: ৯:১০:৫৮ ২৫ বার পঠিত