![]()
এইচএসসি শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের জন্য জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছেন। সেই ব্যাপারে বলতে চাই, আমি কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু বলতে চাইনি। যদি কেউ আহত হয়ে থাকেন আমি সিম্পলি দুঃখ প্রকাশ করছি। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এদিন প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সংসদ ভবনের দিকে ছাত্ররা আসছে পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে। গতকাল পদার্থ দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা হয়েছে। এ ছাড়া হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষার সময় বৃষ্টি ছিল। অনেকে ভিজেছে, অনেকে সঠিকভাবে পরীক্ষা দিতে পারেনি। আমরা যদিও সব সময় মনিটরিংয়ে ছিলাম। শিক্ষার্থীদের দাবি এসেছে পরীক্ষা পেছানোর জন্য। ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামের পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের পুনরায় পরীক্ষা নিতেই হবে।’ পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমালোচনার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি ফোনালাপের ভিডিও।
রাজধানীর সিটি কলেজের এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক মন্ত্রীকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে মেয়ের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করেন। সেই কথোপকথন অন্য একটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয় এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে পরীক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো তো ফার্মের মুরগি। একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর চলে আসে।’
শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান: এদিকে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। স্পিকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের সকলেই উদ্বিগ্ন এই বৃষ্টির সিজনের পরীক্ষা নিয়ে। আমরা সব সময় মনিটরিংয়ে ছিলাম, এখনো আছি। সারা দিনই আমরা এই কাজটি করে থাকি। তিনি বলেন, সেখানে দেখা গিয়েছে, যদি পরীক্ষার কোনো কেন্দ্রে পানি উঠে থাকে, তাৎক্ষণিকভাবে আমরা কেন্দ্র সরিয়ে দেই। লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ যাবৎ শুধু একটি কলেজ, কুমিল্লা সরকারি কলেজের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই কলেজের মাঠটা ভরে গিয়েছিল। তাছাড়া অন্যান্য জায়গায় যখনই পানি উঠেছে, তবে সেটা তেমন বেশি নয়, গুটিকয়েক এবং সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্র পাল্টানো হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের শুধরে দেয়া আমাদের জন্য কোনো বিরাট কাজ নয়। কারণ আমরা অনেক জায়গায় পরীক্ষা বন্ধ করেছি এবং আবার আমাদের কোশ্চেন সেট রয়েছে, আমরা আবার তাদের পরীক্ষা নেবো। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, আমরা আবারো পর্যালোচনা করছি যদি কোথাও আমাদের
প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ওঠার পর যদি পরীক্ষা না দিতে পেরে থাকে এই জরিপটা আমাদের কাছে আসার পরে সেভাবে প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষাও নিতে পারি। আমরা চিটাগাং বোর্ডে এই ব্যবস্থাটি করেছি এবং সেই অবস্থান আমাদের রয়েছে। সেজন্য আবারো অনুরোধ করবো, শিক্ষার্থীরা যার যার পড়ার টেবিলে ফিরে যাক, তাদের চেয়ে আমরাই উদ্বিগ্ন। তাদের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন যে কীভাবে তাদের আমরা পরীক্ষা সঠিকভাবে নেবো। এই দুর্যোগ মোকাবিলা করবো।
পাবলিক পরীক্ষার জন্য আলাদা ও স্থায়ী কেন্দ্র করার পরিকল্পনা করছে সরকার: দেশে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘসময় বন্ধ রাখতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়ে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং শিক্ষা কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালু রাখতে এবার পৃথক ও স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এ তথ্য জানান।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার জন্য পৃথক ও স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রস্তাব বর্তমানে অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে সমীক্ষার সুপারিশের ভিত্তিতে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। তিনি জানান, এ ধরনের স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপিত হলে পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আগামী বছর জানুয়ারিতে এসএসসি, জুনে এইচএসসি পরীক্ষা: এদিকে আগামী শিক্ষাবর্ষে (২০২৭ সালে) জানুয়ারিতে এসএসসি, জুনে এইচএসসি পরীক্ষার নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। কক্সবাজার-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য লুৎফুর রহমানের এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান মন্ত্রী। এদিকে এইচএসসি’র মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এবং বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান বিষয় পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরও কেন তা দুই-একদিন পেছানো হলো না, তা জানতে চেয়ে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সারা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের মতামত বিশ্লেষণ করেই পরীক্ষা যথাসময়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
একইসঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ভুলের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেয়া হবে বলেও সংসদকে আশ্বস্ত করেন মন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রী জানান, সারা বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় ২ হাজার ৭০০টি কেন্দ্রে একযোগে পরীক্ষা শুরু হয়। চট্টগ্রামে বন্যার কারণে ইতিমধ্যে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ পুরো চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। চলমান পরিস্থিতির ওপর সরকার সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছিল এবং ৬৪ জেলার এসপি, আটটি বিভাগীয় কমিশনার, প্রতিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ইউএনওদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল। এমনকি আবহাওয়ার পূর্বাভাসের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়। তারা সবাই পরিস্থিতি অনুকূলে থাকবে বলে জানানোর পর, বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে পরীক্ষা যথাসময়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ সময়: ১:৩৩:৩৭ ১০ বার পঠিত