বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার সময়ের দাবি

প্রথম পাতা » প্রধান সংবাদ » পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার সময়ের দাবি
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬



পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার সময়ের দাবি

বাংলাদেশের পুলিশি ব্যবস্থা আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং জন-আস্থার মূল স্তম্ভ হিসাবে যে বাহিনীটির কাজ করার কথা, সময়ের ব্যবধানে সেই প্রতিষ্ঠানটি নানা অভিযোগ, বিতর্ক এবং আস্থাহীনতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং পেশাদারির ঘাটতি-সব মিলিয়ে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এটি আর শুধু প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠনের প্রশ্ন।

পুলিশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসাবে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবহার। যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিরপেক্ষ না থেকে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়, তখন আইন ও ন্যায়ের ধারণাই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিরোধী মত দমন, ভিন্নমতকে অপরাধ হিসাবে উপস্থাপন, কিংবা নির্বাচনি বা রাজনৈতিক স্বার্থে আইন প্রয়োগে বৈষম্য-এসব ঘটনা জনমনে গভীর ক্ষোভ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। এমন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ পুলিশকে রক্ষক হিসাবে নয়, বরং ভয়ের প্রতীক হিসাবে দেখতে শুরু করে, যা একটি রাষ্ট্রের জন্য বড় বিপৎসংকেত। আরেকটি গুরুতর দুর্বলতা হলো জবাবদিহির অভাব। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলেও কার্যকরভাবে তার তদন্ত বা বিচার হয় না। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাব্যবস্থাও অনেক সময় প্রভাবিত বা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা ধীরে ধীরে পুরো প্রতিষ্ঠানকে ক্ষয় করে। একজন সদস্যের অপরাধে যদি শাস্তি না পান, তাহলে তা অন্যদের জন্যও ভুল বার্তা তৈরি করে যে ক্ষমতার অপব্যবহার করলেও পার পাওয়া সম্ভব।

প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। আধুনিক আইন প্রয়োগ শুধু শক্তি প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া, সংঘাত নিরসন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা ডি-এস্কেলেশন, জনসম্পৃক্ততা বা মানবিক আচরণের প্রশিক্ষণে যথেষ্ট দক্ষ নন। এর ফলে ছোট একটি ঘটনা বড় সংঘর্ষে রূপ নেয়, যা এড়ানো সম্ভব ছিল সঠিক দক্ষতা ও মানসিকতা থাকলে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যখন যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা অন্য কোনো অনৈতিক উপাদান নিয়োগে ভূমিকা রাখে, তখন বাহিনীর ভেতরে পেশাদারির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়। একজন সদস্য যদি শুরু থেকেই মনে করেন যে, তার অবস্থান অর্জিত হয়েছে যোগ্যতার মাধ্যমে নয়, বরং প্রভাবের মাধ্যমে-তাহলে তার দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির মানসিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এছাড়া পুলিশের সঙ্গে জনগণের দূরত্বও একটি বড় সমস্যা। কমিউনিটি পুলিশের ধারণা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক না থাকলে তথ্য আদান-প্রদান, অপরাধ প্রতিরোধ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা না থাকলে তারা সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয় না, বরং দূরে সরে যায়; যা অপরাধ দমনে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ প্রেক্ষাপটে যে সংস্কারগুলো প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো শুধু নীতিগত বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নের স্পষ্ট কাঠামো, আইনি ভিত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। নিচে প্রতিটি পয়েন্ট আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো :

প্রথমত, স্বাধীন ও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা শুধু একটি নতুন সংস্থা তৈরি করার বিষয় নয়; এটি হতে হবে একটি সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, যার কার্যক্রমে নির্বাহী হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না। এ সংস্থার নিজস্ব তদন্ত ক্ষমতা থাকতে হবে-যাতে তারা সরাসরি সাক্ষ্যগ্রহণ, নথি তলব, ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে প্রসিকিউশন সুপারিশ করতে পারে। অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়াটি সহজ, নিরাপদ এবং নাগরিকবান্ধব করতে হবে-অনলাইন পোর্টাল, হটলাইন এবং গোপনীয় অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে বাহিনীর ভেতরের সৎ সদস্যরাও নির্ভয়ে অনিয়ম প্রকাশ করতে পারেন। এছাড়া এ সংস্থার বার্ষিক ও ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে। একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-এ পর্যবেক্ষণ সংস্থা যেন শুধু শাস্তিমূলক না হয়ে প্রতিরোধমূলক ভূমিকাও পালন করে, অর্থাৎ কোথায় কাঠামোগত দুর্বলতা আছে তা চিহ্নিত করে সংস্কারের সুপারিশ দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণব্যবস্থার আধুনিকায়নকে একটি ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নব্যবস্থায় রূপ দিতে হবে। বর্তমান প্রশিক্ষণ কাঠামোতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং ‘service-oriented policing’ ধারণাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মানবাধিকার, আইনের শাসন, লিঙ্গ সংবেদনশীলতা, সংখ্যালঘু অধিকার, ভিকটিম সাপোর্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্য-এসব বিষয়কে বাধ্যতামূলক মডিউল হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সংঘাত নিরসন (de-escalation), crowd management, negotiation skills এবং crisis communication-এর ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ জরুরি। প্রযুক্তির যুগে সাইবার ক্রাইম, ডিজিটাল ফরেনসিক, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহারেও দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন এককালীন না হয়ে কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, যেখানে তারা বাস্তব পরিস্থিতির অনুকরণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলন করবেন।

তৃতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু। নিয়োগের প্রতিটি ধাপ-লিখিত পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা যাচাই, মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা-সবকিছু ডিজিটালাইজড ও রেকর্ডভিত্তিক করতে হবে, যাতে কোনো অনিয়মের সুযোগ না থাকে। পটভূমি যাচাই শুধু অপরাধ রেকর্ড নয়; প্রার্থীর সামাজিক আচরণ, আর্থিক লেনদেন এবং নৈতিক অবস্থানও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য একটি স্বাধীন নিয়োগ বোর্ড গঠন করা যেতে পারে, যেখানে পুলিশবাহিনীর বাইরের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নিয়োগের পর একটি ‘probationary period’ রাখা উচিত, যেখানে প্রার্থীর আচরণ, শৃঙ্খলা ও পেশাদারি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে বাহিনীর ভেতরে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ ও পারফরম্যান্সভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তারা এগিয়ে আসতে পারেন।

চতুর্থত, কমিউনিটি পুলিশিংকে বাস্তব রূপ দিতে হলে এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি থানাকে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে একটি ‘partnership model’-এ কাজ করতে হবে। নিয়মিত ‘community dialogue’ বা উন্মুক্ত বৈঠকের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যাগুলো সরাসরি শোনা এবং সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মন্দির, বাজার-এসব স্থানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে পুলিশের মানবিক ও সেবামূলক চিত্র তুলে ধরতে হবে। বিট পুলিশিংকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে হবে, যাতে মানুষ থানায় যেতে ভয় না পায়।

পঞ্চমত, জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাব্যবস্থাকে আধুনিক ও নিরপেক্ষ করতে হবে, যাতে অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত হয়। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বাহ্যিক তদারকি সংস্থার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, যাতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে। প্রতিটি থানায় ‘অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণব্যবস্থা’ চালু করতে হবে, যেখানে অভিযোগের অগ্রগতি নাগরিকরা নিজেই পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

এ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রয়োজন-যেখানে সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, প্রয়োজনীয় বাজেট এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্ধারিত থাকবে। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া; এটি একদিনে সম্পন্ন হয় না। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে বাংলাদেশ একটি এমন পুলিশবাহিনী গড়ে তুলতে পারবে, যা শুধু আইন প্রয়োগকারী নয়, বরং জনগণের আস্থা ও নিরাপত্তার প্রকৃত প্রতীক হয়ে উঠবে। সবশেষে এ সংস্কার শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সাহস এবং সামাজিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে এগিয়ে যেতে চায়, তাহলে পুলিশ সংস্কার আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। একটি বিশ্বাসযোগ্য পুলিশবাহিনীই পারে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে ভাঙা আস্থার সেতুটি পুনর্গঠন করতে। সেই লক্ষ্যেই এখন প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, সুপরিকল্পিত সংস্কার এবং দৃঢ় বাস্তবায়ন।

মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, কলাম লেখক

বাংলাদেশ সময়: ৯:৫২:১৫   ১৪ বার পঠিত