![]()
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা মো. জোবায়েদ হোসাইনকে হত্যার ঘটনাটি কোনো তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এক মাস ধরে পরিকল্পনা করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।
প্রায় ৯ মাসের তদন্ত শেষে বংশাল থানা পুলিশ আদালতে যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে, তাতে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক তথ্য।
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রেমের সম্পর্কের জটিলতা এবং অন্তরঙ্গ ছবি–ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই ছিল এই হত্যার মূল কারণ। ভিযোগপত্রে ৫০ জন সাক্ষীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফরেনসিক, ডিএনএ পরীক্ষা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আলামতের বিশ্লেষণ যুক্ত করা হয়েছে।
প্রায় ৯ মাসের তদন্ত শেষে গত ৩০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফ হোসেন। এতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযুক্তরা হলেন- ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৯), তাঁর প্রেমিক মাহির রহমান (১৯) এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে (২১)। পুলিশের ভাষ্য, মাহির ছিলেন মূল হামলাকারী, বর্ষা হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং আয়লান সহযোগী।
নিহত জোবায়েদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কুমিল্লা জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। ফরাশগঞ্জে মেসে থাকতেন তিনি।
২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার ১৫ নুরবক্স লেনের রৌশান ভিলা নামের একটি বাসার সিঁড়ি থেকে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ভবনেই তিনি বর্ষাকে টিউশনি করাতেন। এ ঘটনায় এক দিন পর নিহত জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রেমের টানাপোড়েন থেকে হত্যার নকশা
তদন্ত ও মোবাইল ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা গেছে, বর্ষা ও মাহিরের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মাঝে তাদের বিচ্ছেদ হলে গৃহশিক্ষক জোবায়েদের সাথে বর্ষার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে বর্ষা আবার মাহিরের সাথে সম্পর্কে জড়ালে, জোবায়েদের কাছে থাকা তাদের অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভোগেন তারা। এমন আশঙ্কা থেকেই দুজন তাকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এ কারণেই গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে জোবায়েদকে হত্যার ছক কষতে শুরু করেন বর্ষা ও মাহির। প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্নভাবে পরিকল্পনা করে শেষ পর্যন্ত হত্যার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
রেকি থেকে হামলা: এক মাসের প্রস্তুতি
তদন্তে বলা হয়েছে, হত্যার ৮-৯ দিন আগে মাহির ও তার বন্ধু আয়লান ঘটনাস্থল (পুরান ঢাকার আরমানিটোলার রৌশান ভিলা) ঘুরে দেখেন। ৬০০ টাকা দিয়ে দুটি সুইচ গিয়ার ছুরি কেনেন। র মধ্যে ৫০০ টাকা বর্ষা তাঁকে বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্ষা নিয়মিত জোবায়েদের টিউশনে আসা–যাওয়ার তথ্য মাহিরকে জানাতেন। ঘটনার দিন (গত বছরের ১৯ অক্টোবর) বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ তার লাইভ লোকেশন ছাত্রী বর্ষাকে পাঠান। বর্ষা তাৎক্ষণিকভাবে সেই তথ্য ওত পেতে থাকা মাহির ও আয়লানের কাছে পৌঁছে দেন। জোবায়েদ ভবনের সিঁড়িতে পৌঁছামাত্রই মাহির তার ওপর অতর্কিত হামলা চালান।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, ১০ ইঞ্চি লম্বা ধারালো সুইচ গিয়ার ছুরি দিয়ে জোবায়েদের ঘাড়ে আঘাত করা হয়। এতে তার গলার ডান পাশের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি (ক্যারোটিড আর্টারি ও ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন) ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়। উদ্ধারকৃত সেই খুনের ছুরিতে মাহিরের ডিএনএ-র মিল পেয়েছে ফরেনসিক ল্যাব বলে অভিযোগপত্রে উল্লাখ করা হয়েছে।
‘বর্ষা আমাকে প্রতিদিন চাপ দিত’
অভিযোগপত্রে মাহিরের দেওয়া জবানবন্দির উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মাহির বলেছেন, বর্ষা তাকে প্রতিদিন জোবায়েদকে খুন করার জন্য চাপ দিতেন। ধরা পড়ার ভয় দেখালে বর্ষা অভয় দিয়ে বলতেন, তাদের পরিবারে অনেক আইনজীবী আছেন। কোথায় মারা যায়? এই প্রশ্নে বর্ষা জানায়, তাদের বাসার নিচতলা সুনশান নীরব থাকায় সেখানেই মারলে সুবিধা হবে। ঘটনার দিনও বেলা একটায় বর্ষা মাহিরকে মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কখন মারবা’।
জবানবন্দিতে মাহির আরও দাবি করেন, ২টি সুইচ গিয়ার ছুরি কিনতে তার ৬০০ টাকা লেগেছে। এর মধ্যে ৫০০ টাকা বর্ষা তাকে বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন।
জবানবন্দি অনুযায়ী, জোবায়েদ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর বর্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে কথা–কাটাকাটির একপর্যায়ে মাহির ব্যাগ থেকে ছুরি বের করে আঘাত করেন। তিনি আয়লানকে ছুরি নিয়ে এগিয়ে আসতে বললে আয়লান যাননি।
রক্তাক্ত অবস্থায় বাঁচার আকুতি
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে , হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় জোবায়েদ কোনোভাবে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে বর্ষার সামনে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু বর্ষা তাকে সাহায্য না করে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে জবানবন্দিতে বলেন, ‘তোর মতো পাপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত।’ এমন তথ্যই বলা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
পুলিশের দাবি, হত্যার কয়েক দিন আগেই মাহির ও আয়লান জোবায়েদকে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন এবং বর্ষাকে আর না পড়ানোর জন্য সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু জোবায়েদ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আশরাফ হোসেন বলেন, হত্যার আগের রাত পর্যন্তও বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কথোপকথন হয়েছিল। ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্ষা অত্যন্ত সুকৌশলে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ফলে জোবায়েদ কোনোভাবেই হত্যার পরিকল্পনার আভাস পাননি।
অভিযোগপত্র আদালতে, শুনানি ১২ আগস্ট
আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি ১৩ জুলাই জিআরও শাখায় পৌঁছেছে। ওই দিন যথাসময়ে উপস্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় আগামী ১২ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক কামাল হোসেন এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু জানান, ডিএনএ রিপোর্ট ও ১৬৪ ধারার জবানবন্দিসহ অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকায় আসামিদের পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে নিহত জোবায়েদের বড় ভাই ও মামলার বাদী এনায়েত হোসেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তবে অভিযুক্ত বর্ষার মা আনিকা রহমান দাবি করেছেন যে তার মেয়ে সম্পূর্ণ নির্দোষ।
বাংলাদেশ সময়: ২১:১৪:১২ ৬ বার পঠিত