![]()
সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে এবার লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাজ্যজুড়ে বহুল প্রতীক্ষিত এই মহারণকে ঘিরে উত্তেজনা ও আলোচনার পারদ চড়তে শুরু করেছে।
দেশটির প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো দুই দলের ঐতিহাসিক বৈরিতা, বিশেষ করে ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত গোল, অতীতের নানা স্মৃতি এবং প্রথমবারের মতো লিওনেল মেসির মুখোমুখি হওয়ার রোমাঞ্চ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছে।
শনিবার রাতে অতিরিক্ত সময়ে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটে আলবিসেলেস্তেরা। অন্যদিকে থ্রি লায়ন্সরা নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয়ে আগেই সেরা চারে জায়গা করে নেয়।
ওই দুই ম্যাচ শেষ হওয়ার পর থেকেই ব্রিটিশ পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতা দখল করে নিয়েছে এই দ্বৈরথের বিশ্লেষণ। ১৯৬৬, ১৯৮৬ এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করছে যে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে এটিই হবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির প্রথম ম্যাচ।
দ্য গার্ডিয়ান এই লড়াইয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কথা স্মরণ করেছে। তারা লিখেছে, ‘আগামী বুধবার রাতে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। ‘হ্যান্ড অব গড’ যে ক্ষোভ ও আলোড়নের জন্ম দিয়েছিল, তা ৪০ বছর পরও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। অবশেষে মেসি এমন একটি ম্যাচে মাঠে নামতে যাচ্ছেন, যা তার অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে আরও বেশি রোমাঞ্চকর হতে বাধ্য।’
একই সুরে দ্য সান দাবি করেছে, ইংল্যান্ডকে যদি শিরোপা জিততে হয় তবে তাদের ‘লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে সিংহাসনচ্যুত’ করতে হবে। পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে, ‘ইংলিশ সমর্থকরা তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ আমেরিকান দলটির বিপক্ষে ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈরিতার এই ম্যাচটি দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন।’
তবে এই পত্রিকাটিই সবচেয়ে ঝাঁঝালো মন্তব্য করেছে। ম্যাচ রিপোর্টে তারা দাবি করেছে যে স্কালোনির দল আসলে ‘১২ জন খেলোয়াড়’ নিয়ে খেলেছে, কারণ পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নানাভাবে সুবিধা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ডেইলি মেইল একে ‘একটি ঐতিহাসিক রাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, ‘এটি কতটা স্মরণীয় একটি রাত হতে যাচ্ছে! মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের কী অদ্ভুত এক কাকতালীয় ঘটনা যে বিগত ২১ বছরে, ছয়টি বিশ্বকাপ এবং ২০৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পরও ৩৯ বছর বয়সি এই তারকা কখনও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি!’
একই সঙ্গে পত্রিকাটি মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচের প্রসঙ্গ টেনে এনেছে যেখানে দিয়েগো ম্যারাডোনা নায়কের মর্যাদা পেয়েছিলেন, ‘মেক্সিকোর বিপক্ষে জয়ের মাধ্যমে ইংল্যান্ড ইতোমধ্যে আজতেকা স্টেডিয়ামের কিছু পুরনো ভূত তাড়াতে পেরেছে। এখন দিয়েগো ম্যারাডোনার কাছে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার ৪০ বছর পর, তারা আর্জেন্টিনার আরেক জাদুকরী পায়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয় মেসির এই ক্লান্ত শরীর আর কতটুকু ধকল নিতে পারে? এটি এমন এক ম্যাচ যা ইতিহাস, নানা গল্প আর পুরনো বকেয়া হিসাবে ঠাসা। আর সাম্প্রতিক ইতিহাস বলে, এটি একটি নির্মম লড়াইয়ের রূপ নিতে পারে।’
ইনডিপেনডেন্ট মন্তব্য করেছে যে, আর্জেন্টিনা ‘সহজ পথ বেছে নেয়নি’, তবে কানসাস সিটির আবহকে তারা গুরুত্ব দিয়েছে, ‘ম্যাচ শেষের উল্লাস ও আলভারেজের সেই চোখধাঁধানো গোলটি দলের পুরো ম্যাচের ম্যাড়মেড়ে পারফরম্যান্সকে আড়াল করে দিয়েছে। অবশ্য এটা নিয়ে তাদের মাথা না ঘামালেও চলবে। কারণ সামনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটা চরম প্রতিশোধের ম্যাচ তাদের সম্পূর্ণ মনোযোগী রাখছে, আর সেই সঙ্গে উপভোগ করার জন্য হুলিয়ান আলভারেজের এক অসাধারণ গোল তো আছেই।’
এদিকে দ্য টেলিগ্রাফ সন্তোষ প্রকাশ করে লিখেছে যে, ‘অবশেষে’ লিওনেল মেসির সঙ্গে ইংল্যান্ডের দেখা হচ্ছে। ‘ইংল্যান্ডের পথের কাঁটা লিওনেল মেসি’- এই শিরোনাম দিয়ে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে যে, ‘আগামী বুধবার পুরনো সব শত্রুতা আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।’ তবে সেই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলেছে যে, সুইজারল্যান্ডের মতো দল এমন নিষ্ঠুর বিদায় পাওয়ার যোগ্য ছিল কি না।
এই চেনা আবহ এবং ফকল্যান্ড যুদ্ধের জীবন্ত স্মৃতির মাঝে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম হতে যাচ্ছে এমন এক সেমিফাইনালের মঞ্চ, যেখানে পুরো বিশ্বের নজর কাড়বে। শুধু বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াই-ই নয়, এই ম্যাচটি আবারও মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে এমন দুটি দলকে, যাদের ইতিহাস অবিস্মরণীয় কিছু ম্যাচ এবং খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়া এক চিরন্তন বৈরিতায় রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ৩:০৬:০০ ৭ বার পঠিত