![]()
নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকার এনায়েত নগরের মো. যোবায়ের হোসিয়ারি কারখানায় কাজ করতেন। ৩ জুন রাত সাড়ে ৮টায় হাজীপুরের কারখানায় ছুটি শেষে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি তাঁকে ঘিরে ধরে ছিনতাইকারীরা। এক পর্যায়ে তাঁর মোবাইল ফোন ও তিন হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে তাঁকে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করা হয়। গত রোববার ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
গত ২৪ এপ্রিল রাতে কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন। এ ছাড়া রোববার মতিঝিলে একজনকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনতাই করা হয়। ৩০ মে গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ঈদের ছুটি কাটিয়ে বাড়ি ফেরা দুই বোনের লাগেজসহ চারটি ব্যাগ ছিনতাই হয়। দুর্বৃত্তরা পিকআপ ভ্যানে এসেঅস্ত্রের মুখেএসব মালপত্র ছিনতাই করে। ভুক্তভোগীরা মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। পুলিশ ও র্যাব দুজনকে গ্রেপ্তার করে।
ছিনতাইকারীর আক্রমণ থেকে বাদ যাচ্ছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যও। গত ৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরে দায়িত্ব পালনকালে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন পুলিশের এক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)। ছিনতাইকারীরা তাঁর পিস্তলটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযানরাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযানে অপরাধীরা গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। রাজধানীতে তুলনামূলক বেশি ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ঘটছে মোহাম্মদপুর-আদাবর ও ওয়ারী এলাকায়। অপরাধীরা আগ্নেয়াস্ত্র ওচাপাতির মতো ধারালো অস্ত্রব্যবহার করছে। ছিনতাই-ডাকাতি করে দ্রুত পালিয়ে যেতে ব্যবহার করছে মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান ও প্রাইভেটকার। ছিনতাইয়ে বাধা পেয়ে গুলি ছুড়তে কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে দ্বিধা করে না তারা। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে সারা দেশে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের তালিকা তৈরি করে গত ১ মে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।রাজধানীতে পুলিশের তালিকায় ১৩৮৭ ছিনতাইকারীঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানিয়েছে, ডিএমপির হালনাগাদ তালিকায় রাজধানীতে এক হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারীর নাম এসেছে। ডিএমপির অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য মহানগরীতে আটটি ক্রাইম বিভাগে ৫০টি থানা রয়েছে। তালিকায় সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারীর সংখ্যা ওয়ারী বিভাগে; ৩০৮ জন। এ ছাড়া তেজগাঁও বিভাগে ২৪০, মতিঝিলে ১৬৮, লালবাগে ১৫৯, রমনা বিভাগে ১৫২ জন, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন ছিনতাইকারী রয়েছে। বিশেষ অভিযানে ১ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত এক হাজার ১০৬ জন সন্ত্রাসী, দস্যু, ছিনতাইকারী ও ডাকাত গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। এর মধ্যে কিছু তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীও আছে।ডিএমপিতে পাঁচ মাসে ৫০ থানায় ১৬২ মামলাডিএমপির সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে রাজধানীর আটটি ক্রাইম বিভাগের ৫০টি থানায় ছিনতাই, দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনায় ১৬২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা ওয়ারী বিভাগে ৩৯টি। এরপরই রয়েছে তেজগাঁও বিভাগ। এ বিভাগের মামলা সংখ্যা ২৮। এ ছাড়া মতিঝিল বিভাগে ২৬, গুলশানে ১৭, রমনা, মিরপুর ও উত্তরায় ১৬টি করে এবং লালবাগে চারটি মামলা হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ঢাকাসহ সারাদেশে চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় তিন হাজার ৮৯৯টি মামলা হয়েছে।
সব ঘটনায় মামলা হচ্ছে নাখোঁজ নিয়ে জানা যায়, থানার মামলা সংখ্যার তুলনায় বাস্তবে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি। কারণ ছিনতাইকারীর আঘাতে খুন কিংবা গুরুতর আহত না হলে থানায় মামলা না করার প্রবণতা আছে ভুক্তভোগীদের মধ্যে। অনেকে মামলাকে ঝামেলা মনে করেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী থানায় গেলেও মামলা নেওয়া হয় না। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়া হয়।
২ জুন গভীর রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ভাড়া করা প্রাইভেটকারে মিরপুরের বাসায় ফেরার পথে আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল নামে এক যুবক খিলক্ষেতে ছিনতাইয়ের শিকার হন। ওই রাতেই তিনি খিলক্ষেত থানায় মামলা করতে যান। পুলিশ তাঁর কাছ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ রেখে দেয়। সেটি আর মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়নি।
ফয়সাল সোমবার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২ জুন রাতে আমি কাতার থেকে দেশে ফিরি। বিমানবন্দরে নেমে রাত ৩টার দিকে ভাড়া করা প্রাইভেটকারে বাসায় ফেরার পথে খিলক্ষেতে ছিনতাইয়ের শিকার হই। ছিনতাইকারীরা আমার দুটি নতুন আইফোন ও ৪৫ গ্রাম স্বর্ণ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে থানায় অভিযোগ দিয়ে আসি। কিন্তু মামলা হয়নি।’এ বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত থানার ওসি সোহরাব হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মামলা হয়েছে কিনা, আমার জানা নেই।’গত রোববার বিকেল ৩টার দিকে মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় লোকমান হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনিয়ে নেয় অস্ত্রধারীরা। তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়জন ছিনতাইকারী ছিল। লোকমান মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জে কমিশনে ডলার কেনাবেচা করেন।
২ জুন রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদমান সাকিব নামে এক শিক্ষার্থী ছিনতাইয়ের শিকার হন। ছিনতাইকারীরা তাঁকে শ্যামলী বাসস্ট্যান্ড থেকে পাশের গলিতে নিয়ে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। এরপর গলিতে আটকে রেখে তাঁর পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এ ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, সাধারণত ছিনতাইকারী চক্র নির্দিষ্ট এলাকায় পরিকল্পিতভাবে কাজ করে। রাতে কোথাও কোথাও পুলিশের টহল কম থাকার সুযোগ নেয় তারা। ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল জোরদার, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া শুধু মাঠপর্যায়ের ছিনতাইকারী নয়, তাদের পেছনে কারা আছে, তা খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খন্দকার রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, মতিঝিলে গুলি করে ডলার ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে ডিএমপি তৎপর রয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলোর অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ছিনতাই প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপিতে বিশেষ অভিযানে ৩১৯০ জন গ্রেপ্তার১ মে থেকে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। ৭ জুন পর্যন্ত তিন হাজার ১৯০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধী রয়েছে। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ২১৫ জন, তালিকার বাইরের চাঁদাবাজ ৪৫৯ জন। সন্ত্রাসী, দস্যু, ছিনতাইকারী ও ডাকাত এক হাজার ১০৬ জন। এ ছাড়া মাদক কারবারি ১ হাজার ৪১০ জন।
বাংলাদেশ সময়: ৮:১৫:২১ ১০ বার পঠিত