শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

রয়টার্স এক্সক্লুসিভ চীনের মরুভূমিতে ‘রহস্যময় সামরিক নগরী’, টার্গেট যুক্তরাষ্ট্র?

প্রথম পাতা » আন্তর্জাতিক » রয়টার্স এক্সক্লুসিভ চীনের মরুভূমিতে ‘রহস্যময় সামরিক নগরী’, টার্গেট যুক্তরাষ্ট্র?
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬



চীনের মরুভূমিতে ‘রহস্যময় সামরিক নগরী’

চীনের প্রত্যন্ত এক মরুভূমি অঞ্চলে বিশাল আকারের একটি সামরিক কমপ্লেক্স গড়ে উঠছে। এনিয়ে কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানিয়েছেন, এটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোনো সম্ভাব্য হামলা চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে না পারে এবং বেইজিংয়ের পাল্টা আঘাত দেয়ার সক্ষমতা নিশ্চিতভাবে বজায় থাকে।

ইতিমধ্যে চীনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো শহরে আঘাত হানতে সক্ষম। এখন বার্তাসংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বেইজিং তার সেনাবাহিনীর দীর্ঘতম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষিত বিচ্ছিন্ন সাইলোগুলোর (ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি) আশপাশে বিস্তৃত লঞ্চ প্যাড, ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার এবং যোগাযোগ কেন্দ্রের জন্য একটি জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।

মরুভূমিতে প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক

চীন দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হামি পারমাণবিক সাইলো ক্ষেত্রের কাছে ৮০টিরও বেশি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং তিনটি অষ্টভুজ আকৃতির স্থাপনা নির্মাণ করেছে।

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, সেখানে ৮০টিরও বেশি কংক্রিট প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেগুলো চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এবং বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটের জন্য ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
পাশাপাশি এমন কিছু স্থাপনাও দেখা গেছে, যেগুলো ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং কমান্ড অপারেশনের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে বলে রয়টার্সের জন্য স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করা তিনজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানিয়েছেন।

এই নির্মাণের ব্যাপ্তি ইঙ্গিত দেয় যে, চীন তার স্থলভিত্তিক পারমাণবিক বাহিনীকে সুরক্ষিত ও পরিচালনার জন্য ব্যাপক হারে সুরক্ষিত অবকাঠামো গড়ে তুলছে। একত্রে এটি বেইজিংয়ের দ্বিতীয় আঘাত সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার বড় অগ্রগতি নির্দেশ করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করছে— বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে উত্তেজনার মধ্যে।

হাওয়াইয়ের প্যাসিফিক ফোরাম থিঙ্ক ট্যাঙ্কের একজন সহযোগী ফেলো আলেকজান্ডার নিল বলেন, এই অবকাঠামো যে বিশাল পরিসরে নির্মিত হচ্ছে, তা আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি— এটি সাইলো ক্ষেত্রের বাইরেও হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার মরুভূমি জুড়ে বিস্তৃত

তিনি বলেন, এটি চীনের কৌশলগত পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি অত্যন্ত বড় ধরনের সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্য নির্দেশ করছে।

চীনের সামরিক নীতি অনুযায়ী, পারমাণবিক সাইলোগুলোকে সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি ন্যূনতম কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ কৌশল অনুসরণ করে— যার মূল ভিত্তি হলো প্রথম আঘাতের পর পাল্টা আঘাত করার সক্ষমতা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সাবমেরিন ও বিমান থেকেও পারমাণবিক অস্ত্র উৎক্ষেপণ করতে পারে। তবে শিনজিয়াং ও গানসু অঞ্চলের সাইলো ক্ষেত্রগুলোই তাদের পারমাণবিক শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

কিছু পশ্চিমা কূটনীতিক ও বিশ্লেষকের মতে, তাইওয়ান নিয়ে সংঘাত হলে চীন পারমাণবিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে যাতে বাইরের হস্তক্ষেপ সীমিত করা যায়।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে দুই দেশের বিরোধ ভুলভাবে পরিচালিত হলে তা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

তবে তাইওয়ান চীনের সার্বভৌমত্ব দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা গোয়েন্দা-সম্পর্কিত বিষয়ে মন্তব্য করবে না।

মরুভূমির অষ্টভুজ স্থাপনা

নতুন প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু হলো দুইটি অষ্টভুজ আকৃতির স্থাপনা, যা গত ছয় বছরে শিনজিয়াংয়ের পূর্বাঞ্চলে নির্মিত হয়েছে। এগুলো হামি সাইলো ক্ষেত্রের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, এসব স্থাপনায় সামরিক কর্মীদের আবাসন এবং বড় সামরিক যান রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলোর চারপাশে সাঁজোয়া বাঙ্কার, অস্ত্র সংরক্ষণাগার, বিমানঘাঁটি এবং রেল সংযোগ রয়েছে, যা হামি সাইলো এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত।

চলতি এবং এপ্রিল মাসে উত্তরাঞ্চলীয় অষ্টভুজের আশপাশে বড় সামরিক যানবাহনের মহড়া দেখা গেছে। সাম্প্রতিক ছবিতে বড় তাঁবু এবং মরুভূমিতে ছদ্মবেশী লঞ্চ সাইটও দেখা যায়, যেগুলোর কিছুতে বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কংক্রিট প্যাডগুলোর সঙ্গে অষ্টভুজ স্থাপনাগুলোর সংযোগ রয়েছে মাটির নিচের রাস্তা ও যোগাযোগ লাইনে , যেখানে ফাইবার-অপটিক কেবল থাকতে পারে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো টং ঝাও বলেন, এসব স্থাপনা সম্ভবত কমান্ড, কন্ট্রোল ও কমিউনিকেশন ব্যবস্থার অংশ, যা হামি সাইলো এলাকার পারমাণবিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক চীনকে অন্যান্য পারমাণবিক শক্তির তুলনায় আলাদা অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় চীনের অস্ত্রভাণ্ডার ছোট হলেও তারা সাধারণত সাইলো সংখ্যা ও কঠিন প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর নির্ভর করে।

পারমাণবিক বিশ্লেষক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, এ ধরনের বিশাল অবকাঠামোর ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন এটি কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তবে কিছুই বাদ দেয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, এটি এমন একটি অসাধারণ প্রচেষ্টা, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ সময়: ২৩:৩৯:০৭   ১২ বার পঠিত