
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর ঘিরে অন্তহীন কৌতূহল। কী বিষয়ে আলোচনা হবে এ নিয়েই দু’দেশের মধ্যে নানা জল্পনা। মঙ্গলবার বিকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুইদিনের সফরে দিল্লি পৌঁছেছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক রয়েছে। পাশাপাশি তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে। দিল্লি পৌঁছেই ড. খলিল বৈঠক করেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে। নানা কারণে এই বৈঠকটি আলোচিত এবং অর্থবহ হবে- এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
খলিল-দোভাল এর আগেও একাধিকবার বৈঠক করেছেন। বেশ কিছু বিষয়ে তারা একমতও হয়েছেন। ঢাকায় নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটাই প্রথম বৈঠক। কূটনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ এই সফরে অন্তত চারটি বিষয় গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- শরীফ ওসমান হাদি হত্যার সঙ্গে যুক্ত আসামিদের প্রত্যর্পণ। গত ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা ভারতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অতি সম্প্রতি পলাতক ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী গ্রেপ্তার করে। এরপর ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। দাবি ওঠে এদের অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনার।
ড. খলিল এই আসামিদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বৈঠকে জোর দেবেন। বাংলাদেশ মনে করে ফয়সাল এবং আলমগীরকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে হত্যার জট খুলবে। এই হত্যা নিয়ে এখনো জমজমাট রহস্য। কারা এবং কেন নির্বাচনের আগমুহূর্তে হাদিকে হত্যা করলো, তা জানা সম্ভব হবে। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, নির্বাচন বানচাল করাই ছিল এই হত্যার অন্যতম উদ্দেশ্য। একটি মহল এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে পানি ঘোলা করতে চেয়েছিল। রাজনৈতিক শক্তিগুলো নির্বাচনের ব্যাপারে অনড় থাকায় তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে বাংলাদেশ তার অবস্থান আবারো স্পষ্ট করবে। বলবে, ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখা দু’দেশের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্কের অন্তরায়। সূত্রগুলো বলছে, ভারত নীতিগতভাবে ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে একমত। কিন্তু তাদের দেশীয় রাজনীতির কৌশল এই মুহূর্তে বাধা। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন না হলে ভিসা যে চালু হবে না তা স্পষ্ট। বিজেপি সরকার তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে পরাস্ত করার জন্য নানা কৌশল নিচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখা অন্যতম।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টির ওপর বিশেষ জোর দেয়া হবে। সীমান্তে হত্যা বন্ধের বিষয়টিও অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। যদিও এ বছর এখন পর্যন্ত একটি মাত্র হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বাংলাদেশ চাইছে কোনো হত্যাকাণ্ডই যেন না ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাবে। অন্তর্বর্তী প্রশাসন বারবার ভারত সরকারের কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকারের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে একই অনুরোধ জানানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে আলোচনা হবে।
এ বছরের ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে ঢাকায় কিছুটা অস্বস্তি আছে। কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার পর বিষয়টি রাজনৈতিক টেবিলে যাবে- এমনটাই মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী এই বছরের মাঝামাঝি সময়ে দিল্লি সফর করতে পারেন। যদিও তিনি প্রথমে ভুটান যাবেন। চীনের তরফেও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি সম্ভবত উপমহাদেশ সফরের পর চীন সফরে যাবেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, ঢাকায় নতুন সরকার আসার পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে তিক্ততা অনেকখানি কমেছে। কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। ওয়াকিবহাল কূটনীতিকরা বলছেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে চলেছে। দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতিও লক্ষ্য করা যায়। প্রয়াত জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের যোগদান ছিল একটি ইতিবাচক ঘটনা। তারেক রহমানের সরকারে শপথ অনুষ্ঠানে সে দেশের স্পিকার ও পররাষ্ট্র সচিবের যোগদান ছিল সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন বার্তা।
বাংলাদেশ সময়: ০:২৭:১৩ ১১ বার পঠিত